Tuesday, June 16, 2026

ইতিহাস বদলে দেওয়া চতুর্থ বিশ্বকাপ: মারাকানার কান্না এবং উরুগুয়ের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন


ছবি: উরুগুয়ের হুয়ান শিয়াফিনোর শটে পরাস্ত হচ্ছেন ব্রাজিলের গোলরক্ষক মোয়াসির বারবোসা।(সংগৃহীতঃপপারফটো)

বিশেষ প্রতিবেদকঃ আরাফাত হাবিব

১৯৫০ সালের ১৬ জুলাই। ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে জড়ো হয়েছিল লাখো মানুষ। কারও হাতে জাতীয় পতাকা, কারও মুখে উৎসবের রং। চারদিকে শুধু একটাই প্রত্যাশা—ব্রাজিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে যাচ্ছে। সংবাদপত্রগুলো আগেই অভিনন্দন বার্তা ছাপিয়ে ফেলেছিল। বিশেষ স্মারক তৈরি হয়েছিল। এমনকি অনেক জায়গায় বিজয় উদযাপনের প্রস্তুতিও সম্পন্ন ছিল।

কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো এমন গল্প লিখে, যা কোনো চিত্রনাট্যকারও কল্পনা করতে পারেন না।

সেদিন মারাকানায় যা ঘটেছিল, তা শুধু একটি ম্যাচের ফল ছিল না। সেটি ছিল একটি জাতির স্বপ্নভঙ্গের গল্প, আর অন্য একটি জাতির অবিশ্বাস্য সাহস ও আত্মবিশ্বাসের জয়গাথা। ফুটবল ইতিহাসে সেই ঘটনার নাম—‘মারাকানাজো’।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালের বিশ্বকাপ বাতিল হয়েছিল। ফলে ১৯৩৮ সালের পর দীর্ঘ ১২ বছর বিশ্বকাপ আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। যুদ্ধ শেষে বিধ্বস্ত ইউরোপ তখনও পুনর্গঠনের কাজে ব্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে ব্রাজিল এগিয়ে আসে বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব নিয়ে। ফুটবলকে কেন্দ্র করে নিজেদের আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিল দেশটি। সেই লক্ষ্যেই রিও ডি জেনেইরোতে নির্মাণ করা হয় বিশাল মারাকানা স্টেডিয়াম, যা সে সময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল স্টেডিয়াম হিসেবে পরিচিতি পায়।

এই বিশ্বকাপ ছিল অনেক দিক থেকেই ব্যতিক্রম। এটি ছিল প্রথম বিশ্বকাপ, যেখানে জুলে রিমের সম্মানে ট্রফিটির আনুষ্ঠানিক নাম রাখা হয় ‘জুলে রিমে কাপ’। আবার বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটিই একমাত্র আসর যেখানে কোনো একক ফাইনাল ম্যাচ ছিল না। প্রথম পর্বের পর চারটি দলকে নিয়ে একটি চূড়ান্ত গ্রুপ গঠন করা হয়। সেই গ্রুপে সবার বিপক্ষে সবাই খেলবে এবং শীর্ষ দল হবে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।

যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে অনেক দল অংশ নেয়নি। ভারতও এই বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত অংশগ্রহণ করেনি। স্কটল্যান্ড যোগ্যতা অর্জন করেও সরে দাঁড়ায়। ফলে নির্ধারিত ১৬ দলের পরিবর্তে মাত্র ১৩টি দল নিয়ে শুরু হয় প্রতিযোগিতা।

শুরু থেকেই ব্রাজিল ছিল অপ্রতিরোধ্য। আক্রমণাত্মক ফুটবল, অসাধারণ গোল করার ক্ষমতা এবং ঘরের মাঠের সমর্থন—সব মিলিয়ে তারা ছিল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে শক্তিশালী দল। সুইডেনকে ৭-১ এবং স্পেনকে ৬-১ গোলে বিধ্বস্ত করে তারা চূড়ান্ত গ্রুপের শেষ ম্যাচে পৌঁছায়। অন্যদিকে উরুগুয়ে তুলনামূলকভাবে কঠিন লড়াই করে এগিয়ে আসছিল। ফলে শেষ ম্যাচের আগে হিসাব ছিল খুবই সহজ—ব্রাজিলের ড্র হলেই চলবে, কিন্তু উরুগুয়েকে জিততেই হবে।

ম্যাচের আগের দিন থেকেই পুরো ব্রাজিল উৎসবে মেতে ওঠে। অনেক সংবাদপত্র ব্রাজিলকে আগেভাগেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে শিরোনাম ছাপে। উরুগুয়ের খেলোয়াড়রা সেই সংবাদপত্র দেখেছিলেন। পরে জানা যায়, উরুগুয়ের অধিনায়ক ওবদুলিও ভারেলা সেই সংবাদপত্রগুলো সংগ্রহ করে সতীর্থদের সামনে ছুঁড়ে দেন এবং সবাইকে মনে করিয়ে দেন যে মাঠের লড়াই এখনো বাকি। তিনি তার দলকে বলেছিলেন, মাঠের বাইরের মানুষ খেলবে না, খেলবে তারাই। সেই কথাগুলো পরবর্তীতে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য হিসেবে পরিচিতি পায়।

১৬ জুলাই মারাকানা স্টেডিয়ামে সরকারি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার দর্শক। তবে অনেক গবেষকের মতে প্রকৃত সংখ্যা দুই লাখের কাছাকাছি ছিল। আজও এটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি দর্শক উপস্থিতির ম্যাচগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

ম্যাচের প্রথমার্ধ গোলশূন্যভাবে শেষ হয়। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ফ্রিয়াসার গোলে ব্রাজিল এগিয়ে যায়। পুরো স্টেডিয়াম তখন উল্লাসে ফেটে পড়ে। মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপ এখন কেবল আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষায়।

কিন্তু উরুগুয়ে হার মানেনি।

ম্যাচের ৬৬ মিনিটে হুয়ান আলবার্তো স্কিয়াফিনো সমতা ফেরান। গোলটি ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের কিছুটা স্তব্ধ করে দেয়। তবুও অনেকেই বিশ্বাস করছিলেন, ড্র হলেই যেহেতু শিরোপা নিশ্চিত, তাই সমস্যা নেই।

এরপর আসে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় মুহূর্ত।

৭৯ মিনিটে ডান প্রান্ত দিয়ে দৌড়ে আসেন আলসিদেস গিগিয়া। সবাই ক্রসের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু তিনি সরাসরি শট নেন। বল জালে জড়িয়ে যায়। উরুগুয়ে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রায় দুই লাখ মানুষের স্টেডিয়াম যেন হঠাৎ নীরব হয়ে যায়। শুধু উরুগুয়ের খেলোয়াড়দের উল্লাস শোনা যাচ্ছিল।

শেষ বাঁশি বাজার পর মারাকানার দৃশ্য ছিল হৃদয়বিদারক। হাজার হাজার মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। কেউ বিশ্বাসই করতে পারছিল না কী ঘটেছে। অনেক ব্রাজিলিয়ান সংবাদপত্র পরদিন এই পরাজয়কে জাতীয় ট্র্যাজেডি হিসেবে বর্ণনা করে। বহু মানুষের কাছে এটি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচে হার ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির স্বপ্নভঙ্গ।

এই পরাজয়ের প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে ব্রাজিল জাতীয় দল তাদের ঐতিহ্যবাহী সাদা জার্সি পরা প্রায় বন্ধ করে দেয়। পরে নতুন নকশার হলুদ জার্সি গ্রহণ করা হয়, যা পরবর্তীতে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে পরিচিত জার্সিগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

অন্যদিকে উরুগুয়ের জন্য এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম গৌরবময় মুহূর্ত। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের পর তারা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। কিন্তু ট্রফির চেয়েও বড় ছিল তারা যে কীর্তি গড়েছিল—ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অসম্ভব মনে হওয়া ম্যাচগুলোর একটিতে ঘরের মাঠে থাকা অপ্রতিরোধ্য ব্রাজিলকে হারিয়ে দেওয়া।

এই বিশ্বকাপে আরেকটি বড় চমক ছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ১-০ গোলের জয়। সে সময় ইংল্যান্ডকে বিশ্বের অন্যতম সেরা দল মনে করা হতো, আর যুক্তরাষ্ট্র ছিল প্রায় অচেনা একটি দল। সেই ফলাফলকেও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে ধরা হয়। একই সঙ্গে দুইবারের চ্যাম্পিয়ন ইতালি প্রথম পর্ব থেকেই বিদায় নেয়।

আজ ৭৫ বছরেরও বেশি সময় পরও ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপের কথা উঠলে মানুষ প্রথমে মনে করে মারাকানার সেই বিকেলটিকে। ফুটবলের ইতিহাসে অসংখ্য ফাইনাল হয়েছে, অসংখ্য চ্যাম্পিয়ন এসেছে-গেছে। কিন্তু খুব কম ম্যাচই একটি দেশের মানসিকতা, ফুটবল সংস্কৃতি এবং জাতীয় পরিচয়ের ওপর এত গভীর প্রভাব ফেলতে পেরেছে।

ফুটবল ইতিহাসে অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু মারাকানাজো এখনও আলাদা। কারণ এটি শুধু উরুগুয়ের জয় নয়, এটি ছিল অসম্ভবকে সম্ভব করার এক জীবন্ত প্রমাণ। আর সেই কারণেই ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপকে অনেকেই শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায় বলে মনে করেন।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন