Sunday, July 26, 2026

সেমিকন্ডাক্টরে নতুন স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ, ২০৩০ সালের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য


ছবিঃ সেমিকন্ডাক্টর শিল্প সম্প্রসারণে কাজ করছে বাংলাদেশ; ২০৩০ সালের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

বাংলাদেশের রপ্তানির কথা উঠলে সাধারণত তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য কিংবা আইটি সেবার নামই আগে আসে। তবে অনেকেরই অজানা, বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন-সংক্রান্ত সেবা রপ্তানি করছে। পরিমাণে ছোট হলেও এই খাতকে ভবিষ্যতের অন্যতম কৌশলগত শিল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA) ২০৩০ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর খাত থেকে রপ্তানি আয় বর্তমান প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজার একই সময়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব এখনও ক্ষুদ্র হলেও এটিকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন নীতিনির্ধারকরা।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে নীতিগত প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সফটওয়্যার, ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন (EDA) টুলস এবং চিপ প্যাকেজিং যন্ত্রপাতির ওপর কাস্টমস শুল্ক, ভ্যাট ও কর-সুবিধার মেয়াদ ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আকর্ষণের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ‘Silicon River USA Roadshow’ এবং ‘BEAR Summit 2026’-এর মতো আন্তর্জাতিক উদ্যোগেও বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।

বিশ্ব রাজনীতিতেও সেমিকন্ডাক্টরের গুরুত্ব দ্রুত বেড়েছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষক ক্রিস মিলার তাঁর বহুল আলোচিত বই Chip War-এ তাইওয়ানের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে ‘Silicon Shield’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, আধুনিক অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, স্মার্টফোন, গাড়ি এবং ক্লাউড কম্পিউটিং—সব ক্ষেত্রেই সেমিকন্ডাক্টর এখন অপরিহার্য। ফলে এই শিল্পে সক্ষমতা অর্জন শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক শক্তিরও প্রতীক।

বাংলাদেশও এই যাত্রা শুরু করেছে শূন্য থেকে নয়। ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন-সেবা রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে দেশে প্রায় ৭০০ জন চিপ ডিজাইনার কাজ করছেন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে VLSI (Very Large Scale Integration) শিক্ষা ও গবেষণা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকায় পরিচালন ব্যয় ভারতের বেঙ্গালুরু ও ফিলিপাইনের সেবুর মতো প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি কেন্দ্রগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম হওয়ায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশ একটি প্রতিযোগিতামূলক গন্তব্য হতে পারে।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ভারত ইতোমধ্যে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ হাজার সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন প্রকৌশলী তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা দক্ষ জনবল, গবেষণা সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক মানের টেস্টিং ও প্যাকেজিং অবকাঠামো।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু চিপ উৎপাদন নয়; একটি পূর্ণাঙ্গ সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। এজন্য প্রয়োজন দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, বিনিয়োগকারী, নীতিনির্ধারক এবং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি প্রযুক্তিবিদদের সমন্বিত উদ্যোগ। পাশাপাশি দেশে আরও VLSI ডিজাইন প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক মানের ATMP (Assembly, Testing, Marking and Packaging) ও OSAT (Outsourced Semiconductor Assembly and Test) সুবিধা গড়ে তোলা এবং অন্তত একটি বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিকে বাংলাদেশে ডিজাইন সেন্টার স্থাপনে আকৃষ্ট করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ রাতারাতি তাইওয়ানের মতো বৈশ্বিক চিপ উৎপাদন কেন্দ্র হয়ে উঠবে না। তবে তরুণ প্রকৌশলী, তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয়, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং সরকারের নীতিগত সহায়তা—এই চারটি শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে আগামী দশকে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর ভ্যালু চেইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হতে পারে।

অর্থনীতির ভবিষ্যৎ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং জাতীয় কৌশলগত স্বার্থ—সবকিছুর সঙ্গেই এখন জড়িয়ে রয়েছে এই ক্ষুদ্র সিলিকন চিপ। সময়মতো সঠিক বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী বড় অর্থনৈতিক মাইলফলক।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন