- ০১ জুলাই, ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদক | আরাফাত হাবিব
পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গা রয়েছে, যেগুলোকে দেখলে মনে হয় সেগুলো যেন কোনো বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর অংশ। যেখানে নেই সূর্যের আলো, নেই বিশুদ্ধ বাতাস, নেই আমাদের পরিচিত পরিবেশ—তবুও সেখানে টিকে আছে জীবন। রোমানিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ‘মোভিল গুহা’ ঠিক তেমনই এক বিস্ময়কর স্থান, যা আজও বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে চলেছে।
১৯৮৬ সালে রোমানিয়ার কৃষ্ণসাগর উপকূলের কাছে একটি শিল্প প্রকল্পের জন্য ভূতাত্ত্বিক জরিপ চলাকালে ঘটনাক্রমে আবিষ্কৃত হয় এই গুহা। প্রথমদিকে এটি একটি সাধারণ ভূগর্ভস্থ গুহা বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা যখন এর গভীরে প্রবেশ করতে শুরু করেন, তখন একের পর এক চমকপ্রদ তথ্য সামনে আসতে থাকে।
গবেষণায় জানা যায়, মোভিল গুহার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ প্রায় ৫৫ লাখ বছর ধরে বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবীতে যখন মানবজাতির অস্তিত্বই ছিল না, তখন থেকেই এই গুহার ভেতরে আলাদা একটি জগত নিজস্ব নিয়মে টিকে আছে।
গুহাটির প্রবেশপথ মাটির প্রায় ২৪ মিটার বা ৮০ ফুট নিচে। সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর গবেষকদের সামনে যে দৃশ্য উন্মোচিত হয়, তা ছিল অভূতপূর্ব। গুহার বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ স্বাভাবিক পরিবেশের তুলনায় অনেক কম। অন্যদিকে কার্বন ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোজেন সালফাইড, মিথেন ও অ্যামোনিয়ার মতো গ্যাসের উপস্থিতি অত্যন্ত বেশি। ফলে বিশেষ সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা প্রায় অসম্ভব।
তবে গুহাটির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর জীববৈচিত্র্য। বিজ্ঞানীরা সেখানে ৫০টিরও বেশি প্রাণী প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন, যাদের অনেকগুলো পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। বিচ্ছিন্ন পরিবেশে দীর্ঘকাল ধরে বিবর্তনের ফলে এসব প্রাণীর শরীরে ঘটেছে আশ্চর্য পরিবর্তন।
গুহার বাসিন্দাদের মধ্যে রয়েছে মাকড়সা, বিচ্ছু, জোঁক, জলজ কীটপতঙ্গ, কেঁচো এবং বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র অমেরুদণ্ডী প্রাণী। তাদের অধিকাংশের শরীরে কোনো রঙ নেই বললেই চলে। অনেকের চোখ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে কিংবা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে অন্ধকারে বসবাস করায় দৃষ্টিশক্তির প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে ফেলেছে তারা। পরিবর্তে স্পর্শ ও রাসায়নিক সংকেত শনাক্ত করার ক্ষমতা অনেক বেশি উন্নত হয়েছে।
সাধারণভাবে পৃথিবীর প্রায় সব বাস্তুতন্ত্রই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সূর্যের আলোর ওপর নির্ভরশীল। উদ্ভিদ সূর্যালোক ব্যবহার করে খাদ্য তৈরি করে, আর সেই খাদ্যশৃঙ্খলের ওপর নির্ভর করে অন্য প্রাণীরা বেঁচে থাকে। কিন্তু মোভিল গুহার বাস্তুতন্ত্র এই প্রচলিত নিয়মকে চ্যালেঞ্জ জানায়।
এখানে জীবনের ভিত্তি তৈরি করেছে বিশেষ ধরনের অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়া। তারা সূর্যের আলো নয়, বরং গুহার পানিতে থাকা সালফার, মিথেন ও অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করে। বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে বলেন ‘কেমোসিন্থেসিস’। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো গুহার দেয়াল ও পানির ওপর ঘন স্তর তৈরি করে, যা পরবর্তীতে অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীর খাদ্যে পরিণত হয়। এভাবেই গড়ে উঠেছে একটি সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ খাদ্যশৃঙ্খল।
গবেষকদের মতে, মোভিল গুহা শুধু পৃথিবীর একটি ব্যতিক্রমী বাস্তুতন্ত্র নয়; এটি মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পৃথিবীর বাইরে কোনো গ্রহ বা উপগ্রহে যদি জীবনের অস্তিত্ব থাকে, তাহলে সেগুলোও হয়তো এমন চরম পরিবেশে টিকে থাকতে পারে।
বিশেষ করে মঙ্গল গ্রহের ভূগর্ভস্থ অঞ্চল কিংবা বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপা এবং শনির উপগ্রহ এনসেলাডাসের বরফাচ্ছাদিত সমুদ্রের নিচে সম্ভাব্য জীবনের সন্ধান নিয়ে গবেষণায় মোভিল গুহা একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানে দেখা গেছে, সূর্যের আলো ছাড়াও শুধুমাত্র রাসায়নিক শক্তির ওপর নির্ভর করে একটি জটিল বাস্তুতন্ত্র টিকে থাকতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বের খুব কমসংখ্যক বিজ্ঞানীই এই গুহায় প্রবেশের অনুমতি পান। কারণ মানব উপস্থিতি বা বাইরের জীবাণু সেখানে প্রবেশ করলে কোটি বছরের পুরোনো এই সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই চলছে গবেষণা।
পৃথিবীর বুকে অসংখ্য রহস্য এখনও অজানা রয়ে গেছে। তবে মোভিল গুহা সেই বিরল স্থানগুলোর একটি, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন কতটা অভিযোজনক্ষম হতে পারে এবং প্রকৃতি কত অবিশ্বাস্য উপায়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে। অন্ধকার, বিষাক্ত গ্যাস আর বিচ্ছিন্নতার মাঝেও যে জীবন নিজের পথ খুঁজে নিতে পারে, মোভিল গুহা তারই এক জীবন্ত প্রমাণ।