- ০৮ জুলাই, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও দুই দেশের সম্পর্ক এখনো চরম উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যেই পারস্য উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে একাধিক জাহাজে হামলার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক উত্তেজনা কমলেও দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ সংকট ও সাম্প্রতিক যুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে ইরানের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
গত মাসে যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছিল। তবে এর পরও পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়নি। সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে তিনটি তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ও সামরিক বাহিনীর পাল্টা হামলার ঘটনায় দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।
আগামী সপ্তাহে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পথ ইরানের জন্য কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইরানের অর্থনীতি বহু বছর ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি, অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে চাপের মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধজনিত অবকাঠামোগত ক্ষতি, ইন্টারনেট বন্ধ থাকা এবং শিল্প খাতে বড় ধরনের বিপর্যয়।
ইরানের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ফার্সি মাস খোরদাদে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ দশমিক ৬ শতাংশে। খাদ্যপণ্যের দাম আরও দ্রুত বেড়েছে। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৩৪ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
তেল, চর্বি, মাংস, পোলট্রি, রুটি ও শস্যজাত পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর ফলে দেশটির বড় একটি অংশের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে এবং ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
সরকারি হিসাবে বেকারত্বের হার প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হলেও শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার কম। তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ২০ শতাংশের বেশি। অনেক কর্মজীবী মানুষ দীর্ঘ সময় কাজ করেও প্রয়োজনীয় আয় করতে পারছেন না।
বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, ইরানের ন্যূনতম মাসিক মজুরি প্রায় ৯৫ মার্কিন ডলারের সমান। ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দরপতন সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ছিল। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর অন্যতম সূচক স্থায়ী বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
প্রায় ৪০ দিনের সামরিক হামলা, বন্দর কার্যক্রমে বাধা, জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি এবং দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বড় ধাক্কা লেগেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ সালে ইরানের প্রকৃত জিডিপি সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
ভিয়েনা ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক স্টাডিজের অর্থনীতিবিদ মাহদি ঘোদসি মনে করেন, সামরিক উত্তেজনা কমলে কিছু খাত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। পরিবহন, খুচরা ব্যবসা, নির্মাণ ও ছোট শিল্প খাতে সাময়িক ক্ষতি পুনরুদ্ধারের সুযোগ রয়েছে।
তবে যেসব কারখানায় যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, শ্রমশক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতার বড় ক্ষতি হয়েছে, সেগুলো পুনরায় চালু করতে দীর্ঘ সময় এবং বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
যুদ্ধের সময় ইরানের তেল-গ্যাস স্থাপনা, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, শিল্প কারখানা, বন্দর, বিমানবন্দর, সড়ক ও সেতুসহ বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু শিল্প ইউনিট ও বিমানবন্দর ধীরে ধীরে কার্যক্রম শুরু করলেও পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার এখনো অনেক দূরের পথ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি। বাজেট ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের চাপ এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলছে।
অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সম্প্রতি জনগণের অসন্তোষ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেছেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে আবারও বিক্ষোভের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পক্ষপাতী কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ইরানের কট্টরপন্থী অংশ এই সমঝোতার বিরোধিতা করছে। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান বড় শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়।
সব মিলিয়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইরানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা।