- ০৭ জুলাই, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
প্রায় ২০ বছর ধরে গাজা উপত্যকার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করার পর বেসামরিক সরকার ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে হামাস। সংগঠনটি জানিয়েছে, গাজার দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্ব এখন একটি ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিনির্ভর অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হবে। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান অচলাবস্থা নিরসন এবং যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে এটি হামাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ।
সোমবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে হামাস-সংশ্লিষ্ট সরকারি গণমাধ্যম দপ্তরের মহাপরিচালক ইসমাইল আল-থাওয়াবতা জানান, প্রশাসনিক প্রধান মোহাম্মদ আল-ফাররা পদত্যাগ করেছেন এবং গাজার বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব ধাপে ধাপে ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)-এর কাছে হস্তান্তর করা হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি, বিদ্যুৎসহ জনসেবা খাতের সরকারি কর্মীরা আগের মতো দায়িত্ব পালন করবেন। তবে তারা নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে কাজ করবেন, যাতে সাধারণ মানুষের সেবা কার্যক্রম ব্যাহত না হয়।
হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম এই সিদ্ধান্তকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নের পথে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, গাজায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং পুনর্গঠনের পরিবেশ তৈরি করাই এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাব এবং যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২৬ সালের শুরুতে গঠিত হয় এনসিএজি। এটি মূলত নিরপেক্ষ ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদ ও প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি অন্তর্বর্তী বেসামরিক কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে কমিটির অস্থায়ী কার্যালয় মিশরের কায়রোয় থাকলেও নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক জটিলতার কারণে সদস্যরা এখনো গাজায় প্রবেশ করতে পারেননি।
এনসিএজির প্রধান আলী আবদেল হামিদ শাথ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাগত পরিবেশ নিশ্চিত করা হলে কমিটি গাজার দায়িত্ব গ্রহণে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তবে কার্যকর প্রশাসনের জন্য একক কর্তৃপক্ষ, অভিন্ন আইনি কাঠামো এবং জবাবদিহিমূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
যদিও হামাস প্রশাসনিক দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে, সংগঠনটি অস্ত্র সমর্পণের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো অবস্থান জানায়নি। বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা নতুন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েল এই ঘোষণাকে পর্যাপ্ত মনে করছে না। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার দাবি করেছেন, কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তর নয়, হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণও করতে হবে। তার অভিযোগ, হামাস সামরিক শক্তি ধরে রেখে বেসামরিক প্রশাসন অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হামাসের এই সিদ্ধান্তের পেছনে একাধিক কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে। একদিকে তারা আন্তর্জাতিক মহল, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজেদের সমঝোতায় আগ্রহী পক্ষ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। অন্যদিকে গাজার পুনর্গঠন এবং প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করাও এই উদ্যোগের লক্ষ্য হতে পারে।
তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজায় সংঘাত পুরোপুরি থামেনি। হামাসের ঘোষণার পরও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তা প্রবেশ, বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রত্যাবর্তন এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, হামাসের প্রশাসনিক দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা গাজার রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করলেও এর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করবে যুদ্ধবিরতির অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।