Tuesday, July 7, 2026

বলিউডের নতুন সিনেমায় পেলেটগান ইস্যু, প্রশ্নের মুখে কাশ্মীরের বাস্তবতার উপস্থাপন


ছবিঃ ১৮ আগস্ট, ২০১৬ তারিখে ভারত-শাসিত কাশ্মীরের শ্রীনগরে পেলেট গানের গুলিতে আহত ছেলেকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন এক বাবা (সংগৃহীত । আল জাজিরা /ক্যাথাল ম্যাকনটন/রয়টার্স)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN 

ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে পেলেটগানের ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে একটি আসন্ন বলিউড চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে। আগামী বছর মুক্তির অপেক্ষায় থাকা চৌহান সিনেমার টিজার প্রকাশের পর কাশ্মীরের অনেক ভুক্তভোগী, মানবাধিকারকর্মী এবং বিশ্লেষক অভিযোগ তুলেছেন, এতে পেলেটগান–আক্রান্ত মানুষের যন্ত্রণা ও কাশ্মীরের বাস্তবতাকে সংবেদনশীলভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।

টিজার প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচকদের মতে, ছবিটির কিছু সংলাপ ও দৃশ্য কাশ্মীরে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত পেলেটগানকে তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যা বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন কাশ্মীরের বাসিন্দা ফেরোজ আসলাম। এক দশক আগে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীর ছোড়া পেলেটগানের আঘাতে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান। বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে পরিবারের ওপর নির্ভরশীল এই তরুণ বলেন, চোখের আলো হারানোর কষ্ট কেবল ভুক্তভোগীরাই বুঝতে পারেন। তার ভাষায়, একটি দিনও যদি কেউ দৃষ্টিশক্তি ছাড়া কাটান, তাহলে এমন ঘটনার ভয়াবহতা উপলব্ধি করা সম্ভব।

আসলামের মতো আরও বহু কাশ্মীরি আজও পেলেটগানের শারীরিক ও মানসিক ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে কাশ্মীরে ভিড় নিয়ন্ত্রণে পেলেটগান ব্যবহারের পর থেকে শত শত মানুষ আংশিক বা সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। ২০১৬ সালে বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর শুরু হওয়া বিক্ষোভে এই অস্ত্রের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। সে সময় নারী, শিশু ও কিশোরসহ অসংখ্য মানুষ আহত হন।

আরেক ভুক্তভোগী মাসরুর খালিদ জানান, ঈদুল আজহার সময় ত্রাণসামগ্রী বিতরণের মধ্যে তিনি পেলেটের আঘাতে গুরুতর আহত হন। দীর্ঘ চিকিৎসা ও একাধিক অস্ত্রোপচারের পরও তার দৃষ্টিশক্তি আর ফিরে আসেনি। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে পরিবারকে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়তে হয়েছে। এখনও তার শরীরে শতাধিক পেলেট রয়ে গেছে, যা অপসারণ করলে আরও জটিল অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হবে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।

জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অতীতে কাশ্মীরে পেলেটগানের ব্যবহারের সমালোচনা করেছে। বিশেষ করে শিশুদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘ ভারত সরকারকে বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিল। ভারতের সর্বোচ্চ আদালতও এক পর্যায়ে পেলেটগানের ব্যবহার অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সীমিত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছিল। তবে ভারত সরকার বরাবরই এটি প্রাণঘাতী গুলির তুলনায় কম ক্ষতিকর ভিড় নিয়ন্ত্রণের উপায় হিসেবে ব্যাখ্যা দিয়ে এসেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে নির্মিত কয়েকটি বলিউড চলচ্চিত্রে রাজনৈতিক বক্তব্য ও নিরাপত্তা ইস্যু প্রাধান্য পেয়েছে। তাদের মতে, এসব চলচ্চিত্রে কাশ্মীরের বাস্তবতা অনেক সময় একপাক্ষিকভাবে তুলে ধরা হয়, ফলে ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা ও মানবিক সংকট আড়ালে থেকে যায়।

অন্যদিকে, কাশ্মীর বিষয়ক গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের বক্তব্য, কাশ্মীরের মানুষের দুর্ভোগকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখার প্রয়োজন রয়েছে। তাদের মতে, যেকোনো শিল্পমাধ্যমের উচিত সংঘাতের শিকার মানুষের বেদনা ও অভিজ্ঞতাকে সম্মানজনকভাবে উপস্থাপন করা।

সিনেমাটি মুক্তির আগেই শুরু হওয়া এই বিতর্ক কেবল একটি চলচ্চিত্রকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং কাশ্মীরে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংঘাত, মানবাধিকার প্রশ্ন এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচারের দাবিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন