- ০৮ জুলাই, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
গাজার শিশুদের কাছে গ্রীষ্মকাল মানেই এখন আর ছুটি, খেলাধুলা কিংবা আনন্দের সময় নয়। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে তাদের প্রতিদিনের জীবন কাটছে বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রামে। পানি সংগ্রহ, খাবারের লাইনে দাঁড়ানো, জ্বালানি কাঠ খোঁজা—এসব দায়িত্বই এখন তাদের শৈশবের অংশ হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের হামলায় গাজার অবকাঠামো ধ্বংস, ব্যাপক প্রাণহানি এবং বাস্তুচ্যুতির কারণে লাখো শিশুর স্বাভাবিক জীবন থেমে গেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলমান সংঘাতের তৃতীয় গ্রীষ্মেও ফিলিস্তিনি শিশুরা পাচ্ছে না শিক্ষা, বিনোদন কিংবা মানসিক স্বস্তির সুযোগ।
গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলের একটি আংশিক ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনে বসে ৩৫ বছর বয়সী ফাতেন নাবহান তার ছয় সন্তানকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। সকাল শুরু হয় পানি সংগ্রহের মধ্য দিয়ে। ক্যাম্পে আসা পানির ট্রাক থেকে প্রয়োজনীয় পানি জোগাড় করাই এখন পরিবারের অন্যতম প্রধান কাজ।
ফাতেন জানান, একসময় গাজার শিশুরা গ্রীষ্মের ছুটিতে খেলাধুলা, ক্যাম্প, ভ্রমণ ও বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকত। কিন্তু যুদ্ধ সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
তিনি বলেন, “আমার সন্তানদের প্রতিদিনের রুটিন এখন শুধু প্রয়োজনীয় কাজ ঘিরে। তাদের জন্য কোনো খেলাধুলা নেই, কোনো আঁকা-রঙ করার সুযোগ নেই, নেই কোনো বিনোদনমূলক কার্যক্রম।”
স্বামীকে হারানোর পর ছয় সন্তানকে একাই বড় করছেন ফাতেন। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার স্বামী রাফাত নিহত হন। এরপর থেকেই সন্তানদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ফাতেন বলেন, “শিশুদের এই বয়সে খেলাধুলা করার কথা, দায়িত্ব নেওয়ার নয়। কিন্তু যুদ্ধ তাদের শৈশব কেড়ে নিয়েছে।”
আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সংস্থাগুলোও গাজার শিশুদের মানসিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। ইউনিসেফের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, গাজার ছোট শিশুরা নিরাপদ ও বিকাশ সহায়ক পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বড় শিশুরা দীর্ঘদিনের শিক্ষা বিচ্ছিন্নতার কারণে মানসিক ও সামাজিক বিকাশের সংকটে পড়ছে।
শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের সময় খেলাধুলা শুধু বিনোদন নয়, এটি শিশুদের মানসিক পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু গাজার বাস্তুচ্যুত শিবিরগুলোতে সেই সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।
ইউনিসেফের ফিলিস্তিন বিষয়ক যোগাযোগ প্রধান জোনাথন ক্রিক্স বলেন, শিশুদের জন্য খেলাধুলা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি তাদের স্বাভাবিক বিকাশের অপরিহার্য অংশ।
গাজার আরেক বাসিন্দা ৪১ বছর বয়সী আসমা সালেহ পাঁচ সন্তান নিয়ে বাস্তুচ্যুত জীবন কাটাচ্ছেন। যুদ্ধের মধ্যে বারবার স্থান পরিবর্তন করেও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
স্থানীয় একটি দাতব্য সংস্থার আয়োজিত গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে তার দুই সন্তান সপ্তাহে মাত্র একদিন অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তবে ওই একটি দিনই তাদের কাছে হয়ে ওঠে বিশেষ আনন্দের মুহূর্ত।
আসমা বলেন, “ক্যাম্পে যাওয়ার দিন তারা খুব সকালে উঠে প্রস্তুতি নেয়। তাদের চোখে যে আনন্দ দেখি, তা অন্য দিনগুলোতে দেখা যায় না।”
তার মতে, নিয়মিত খেলাধুলা ও দলগত কার্যক্রম শিশুদের আত্মবিশ্বাস, সামাজিক দক্ষতা ও মানসিক স্থিতি বাড়ায়। কিন্তু দীর্ঘদিন তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বন্দি থাকা শিশুদের মধ্যে হতাশা, উত্তেজনা ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব বাড়ছে।
সন্তানদের মানসিক চাপ কমাতে আসমা সম্প্রতি একটি দাতব্য সংস্থা থেকে পাওয়া রঙ পেন্সিল ও কাগজ দিয়ে তাদের সঙ্গে আঁকা-আঁকির আয়োজন করছেন।
তিনি বলেন, “এক ঘণ্টার খেলাধুলা বা ছবি আঁকার মধ্যেও শিশুদের আচরণে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। তারা কিছু সময়ের জন্য হলেও যুদ্ধের ভয়াবহতা ভুলতে পারে।”
গাজার শিশুদের জন্য এখন ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্তই হয়ে উঠেছে বড় পাওয়া। ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে তারা শুধু একটি স্বাভাবিক শৈশবের অপেক্ষায় রয়েছে—যেখানে থাকবে স্কুল, খেলা, হাসি আর নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন।