- ০৮ জুলাই, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সিরিয়া সফরের সময় রাজধানী দামেস্কে একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনায় দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার (স্থানীয় সময়) ম্যাক্রোঁর অবস্থান করা হোটেলের কাছাকাছি এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১৮ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সানা।
সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী একটি সন্দেহজনক বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করার সময় প্রথম বিস্ফোরণটি ঘটে। এর কয়েক মিনিট পর দ্বিতীয় আরেকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। তবে হামলার পেছনে কারা জড়িত, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দীর্ঘদিনের শাসক বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নতুন নেতৃত্বাধীন সিরিয়া সরকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। ম্যাক্রোঁ ছিলেন আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়া সফর করা প্রথম ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের নেতা।
সাম্প্রতিক বিস্ফোরণগুলোর দায় এখনো কোনো গোষ্ঠী স্বীকার করেনি। তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, হামলার সঙ্গে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) বা তাদের অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক জড়িত থাকতে পারে।
নিউইয়র্কভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনালের গবেষক অ্যারন লুন্ড বলেন, আইএস এখনো সিরিয়া ও আশপাশের অঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে। বড় ধরনের হামলা চালানোর জন্য তাদের বিপুল সংখ্যক যোদ্ধার প্রয়োজন নেই; কয়েকজন সদস্য দিয়েও তারা বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি করতে পারে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সিরিয়া ও ইরাকে এখনো আইএসের প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার যোদ্ধা সক্রিয় রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন সরকার বাশার আল-আসাদের পতনের পর দেশটির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তবে দীর্ঘ ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধের ক্ষত, অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দামেস্ক আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কিছু এলাকায় সরকারের কর্তৃত্ব এখনো দুর্বল। স্থানীয় মিলিশিয়া ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করেই অনেক জায়গায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক নানার হাওয়াচ বলেন, সিরিয়ার বর্তমান বিরোধী শক্তিগুলো তিন ভাগে বিভক্ত—আইএসের গোপন সেল, সাবেক আসাদ সরকারের অনুগত গোষ্ঠী এবং উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের কিছু সশস্ত্র পক্ষ।
যুদ্ধের কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত সিরিয়ার অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করাও সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। বিদেশি বিনিয়োগ এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আসেনি। যদিও যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ ধীরে ধীরে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার উদ্যোগ নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিষেধাজ্ঞা কমলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে একই সঙ্গে নতুন সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
নিউ লাইনস ইনস্টিটিউটের গবেষক ক্যারোলিন রোজ মনে করেন, নতুন সিরিয়া সরকারের সবচেয়ে বড় হুমকি বাইরের চেয়ে ভেতর থেকেই আসতে পারে। তার মতে, সাবেক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হলে তা সরকারের স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে।
ম্যাক্রোঁর দামেস্ক সফর ছিল সিরিয়ার নতুন সরকারের জন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, পুনর্গঠন সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে এই সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
তবে সফরের সময়ের বিস্ফোরণ নতুন সরকারের নিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়ায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন পরিকল্পনাও প্রয়োজন হবে।