- ১১ জুন, ২০২৬
আরাফাত হাবিব
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপ বিশ্বকে একটি নতুন আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতার স্বাদ দিয়েছিল। তবে চার বছর পর ইতালিতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ছিল একেবারেই ভিন্ন বাস্তবতার গল্প। এটি শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট ছিল না; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ, বিতর্ক, কৌশলগত ফুটবল এবং ইউরোপীয় শক্তির উত্থানের ইতিহাস। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপই আধুনিক বিশ্বকাপের ভিত্তি গড়ে দেয়।
তৎকালীন ইতালি ছিল বেনিতো মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী শাসনের অধীনে। দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের শক্তি ও মর্যাদা তুলে ধরতে আগ্রহী ছিল। সেই লক্ষ্যেই বিশ্বকাপ আয়োজনকে একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখেছিল রোম। উরুগুয়ের পরিবর্তে ইতালিকে আয়োজক নির্বাচনের পর থেকেই টুর্নামেন্টটি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করে স্টেডিয়াম সংস্কার করে এবং পুরো দেশকে বিশ্বকাপের আবহে সাজিয়ে তোলে।
তবে শুরু থেকেই প্রতিযোগিতাটি ছিল নানা নাটকীয়তায় ভরপুর। প্রথম বিশ্বকাপজয়ী উরুগুয়ে এই আসরে অংশ নেয়নি। ১৯৩০ সালের বিশ্বকাপে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার অজুহাতে উরুগুয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় উরুগুয়ে ইতালির বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে ইতিহাসের প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে ছাড়াই মাঠে গড়ায় দ্বিতীয় বিশ্বকাপ।
এই আসরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বাছাইপর্ব। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মূল পর্বে ওঠার জন্য দলগুলোকে বাছাইপর্ব খেলতে হয়েছিল। ৩২টি দেশ অংশ নেয় বাছাইয়ে, যা সে সময়ের জন্য একটি বড় সংখ্যা ছিল। শেষ পর্যন্ত ১৬টি দল চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেয়। এমনকি স্বাগতিক ইতালিকেও সরাসরি সুযোগ দেওয়া হয়নি; তাদেরও বাছাইপর্ব পেরিয়ে আসতে হয়েছিল। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটি ছিল একমাত্র আসর যেখানে স্বাগতিক দলকেও বাছাইপর্ব খেলতে হয়েছে।
১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল সরাসরি নকআউট পদ্ধতি। বর্তমানের মতো গ্রুপপর্ব তখন ছিল না। একটি ম্যাচ হারলেই বিদায় নিতে হতো। ফলে প্রতিটি ম্যাচই ছিল বাঁচা-মরার লড়াই।
টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই স্বাগতিক ইতালি নিজেদের শিরোপার দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। কোচ ভিত্তোরিও পোৎসোর অধীনে দলটি ছিল সুসংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। তাদের দলে ছিলেন জিউসেপ্পে মিয়াজা, লুইস মন্তি, আত্তিলিও ফেরারিস ও জিওভান্নি ফেরারির মতো তারকা ফুটবলার, যাদের অনেকেই পরে ইতালির ফুটবল ইতিহাসের কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন।
কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালি ও স্পেনের ম্যাচটি আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ও শারীরিকভাবে কঠিন ম্যাচগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। ম্যাচটি ১–১ গোলে ড্র হওয়ার পর পুনরায় ম্যাচ আয়োজন করা হয়, কারণ তখন টাইব্রেকারের নিয়ম চালু ছিল না। প্রথম ম্যাচে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে একাধিক সংঘর্ষ, কঠিন ট্যাকল এবং আঘাতের ঘটনা ঘটে। পুনরায় আয়োজিত ম্যাচে ইতালি ১–০ গোলে জয় পেয়ে সেমিফাইনালে ওঠে। স্পেনের অনেক সমর্থক ও ক্রীড়া বিশ্লেষক পরে অভিযোগ করেছিলেন যে রেফারিংয়ের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ইতালির পক্ষে গিয়েছিল।
সেমিফাইনালে ইতালি মুখোমুখি হয় অস্ট্রিয়ার। সে সময় অস্ট্রিয়াকে ইউরোপের অন্যতম সেরা দল হিসেবে ধরা হতো। তাদের দলটি পরিচিত ছিল "ভুন্ডারটিম" বা বিস্ময়কর দল নামে। কিন্তু স্বাগতিকদের রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা এবং কৌশলগত ফুটবলের সামনে অস্ট্রিয়া হার মানে। ১–০ গোলের জয় নিয়ে ইতালি ফাইনালে পৌঁছে যায়।
অন্যদিকে চেকোস্লোভাকিয়া নিজেদের ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নেয়। ফলে ১৯৩৪ সালের ১০ জুন রোমের জাতীয় স্টেডিয়ামে প্রায় ৫৫ হাজার দর্শকের সামনে অনুষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনাল।
ফাইনালের বেশিরভাগ সময় দুই দলই সতর্ক ফুটবল খেলছিল। ম্যাচের ৭৬ মিনিটে আন্তোনিন পুচের গোলে এগিয়ে যায় চেকোস্লোভাকিয়া। তখন মনে হচ্ছিল বিশ্বকাপের নতুন চ্যাম্পিয়ন পেতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্ব। কিন্তু মাত্র কয়েক মিনিট পর রাইমুন্দো অরসি অসাধারণ এক গোল করে ইতালিকে সমতায় ফেরান। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে আঞ্জেলো স্কিয়াভিওর গোল ইতালিকে ২–১ ব্যবধানে এগিয়ে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবধানই শিরোপা নির্ধারণ করে।
ফাইনালের বাঁশি বাজতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো ইতালি। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশটি শুধু নিজেদের প্রথম শিরোপাই জেতেনি, বরং প্রথম ইউরোপীয় দল হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাসও গড়ে।
তবে শিরোপা জয়ের পরও বিতর্ক থামেনি। কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন গবেষণা, বই ও ক্রীড়া বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে যে মুসোলিনির সরকার বিশ্বকাপে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিল। কিছু রেফারিং সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে প্রশ্নও উঠেছিল। যদিও এসব অভিযোগের অনেকগুলোর পক্ষে চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে বহু ফুটবল ইতিহাসবিদ মনে করেন, ইতালির দলটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তারা যেকোনো পরিস্থিতিতেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার ছিল।
এই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জেতেন চেকোস্লোভাকিয়ার ওলদ্রিখ নেজেদলি। তিনি পাঁচটি গোল করেন। পুরো টুর্নামেন্টে ১৭ ম্যাচে ৭০টি গোল হয়, যা সে সময়ের ফুটবলের আক্রমণাত্মক চরিত্রেরই প্রতিফলন ছিল।
আজ প্রায় একশ বছর পর ফিরে তাকালে ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপকে শুধু একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা যায় না। এটি ছিল এমন একটি আসর, যেখানে বিশ্ব ফুটবল প্রথমবারের মতো ইউরোপের কেন্দ্রে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করে। একই সঙ্গে এই টুর্নামেন্ট দেখিয়ে দেয়, ফুটবল কখনো কখনো মাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনীতি, সমাজ এবং জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে যেতে পারে।
আর সেই কারণেই ইতালির দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয় শুধু একটি ট্রফি জয়ের গল্প নয়; এটি বিশ্ব ফুটবলের বিকাশ, বিতর্ক এবং ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক অধ্যায়ের নাম।