Tuesday, July 28, 2026

গাজা যুদ্ধের ছায়ায় জার্মানির অস্ত্র বাণিজ্য, বাড়ছে আন্তর্জাতিক বিতর্ক


ছবিঃ ২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল জার্মানির কিয়েলে যুদ্ধজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিকেএমএস (TKMS)-এর একটি শিপইয়ার্ডে নোঙর করা একটি সাবমেরিন (সংগৃহীত । আল জাজিরা /ফাবিয়ান বিমার/রয়টার্স)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN 

ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র রপ্তানির অনুমোদনে বড় ধরনের বৃদ্ধি করেছে জার্মানি। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশটি ইসরায়েলের জন্য প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৯১৩ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের অস্ত্র রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে। বার্লিন সরকার জানিয়েছে, গত ২০ মাসে দেওয়া অনুমোদনের মোট পরিমাণের চেয়েও এই পাঁচ মাসের অনুমোদন বেশি।

জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটির পার্লামেন্টে উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। প্রশ্নটি করেছিল ডানপন্থি দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (AfD)। সরকারি তথ্য বলছে, অনুমোদনের প্রায় পুরো অংশই দেওয়া হয়েছে চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে।

এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে জার্মান সরকার উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তবে একই সময়ে ইসরায়েলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ ইউরোপীয় মিত্র হিসেবে দেশটির অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।

জার্মান সরকারের তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত অস্ত্র রপ্তানির মূল্যের ৬০ শতাংশের বেশি একটি বড় সামুদ্রিক প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। যদিও প্রকল্পটির নাম প্রকাশ করা হয়নি, বিশ্লেষকদের ধারণা, এটি জার্মান প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান টিকেএমএস (TKMS) নির্মিত একটি সাবমেরিন প্রকল্প।

ধারণা করা হচ্ছে, এটি ইসরায়েলি নৌবাহিনীর জন্য নির্মিত ডলফিন-২ শ্রেণির সাবমেরিন ‘আইএনএস ড্রাকন’। জার্মান গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাবমেরিনটির মূল্য প্রায় ৪৮০ মিলিয়ন ইউরো এবং এটি সম্প্রতি ইসরায়েলের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবমেরিনটিতে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতা থাকতে পারে। এর ফলে ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতায় নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জার্মান সরকারের অস্ত্র রপ্তানি নীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

বন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর কনফ্লিক্ট স্টাডিজের গবেষক ম্যাক্স মুচলার বলেন, অস্ত্র রপ্তানির বিষয়ে সরকারের পর্যাপ্ত স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। তার মতে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এসব অস্ত্র কীভাবে ব্যবহৃত হতে পারে, সেই বিষয়টি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

ইসরায়েলের সঙ্গে জার্মানির অস্ত্র বাণিজ্য নিয়ে বার্লিনের অবস্থানে বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন দেখা গেছে। এর আগে জার্মান সরকার জানিয়েছিল, গাজায় ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে এমন সামরিক সরঞ্জামের নতুন অনুমোদন সীমিত করা হবে।

তবে পরবর্তীতে সেই অবস্থান পরিবর্তন করে আবারও অস্ত্র রপ্তানির আবেদনগুলো পৃথকভাবে পর্যালোচনা শুরু করা হয়। এর মধ্যেও আগে অনুমোদিত অস্ত্র সরবরাহ চালু ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক আদালতের কার্যক্রম, গাজা পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরে জনমতের চাপ—সব মিলিয়ে জার্মান সরকারের ওপর এক ধরনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।

জার্মানি বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির অর্থনীতি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ১৩ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের অস্ত্র রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় চার গুণের বেশি।

জার্মান অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা বর্তমানে ইউক্রেন। তবে ইউরোপজুড়ে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দেশটির অস্ত্র শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (SIPRI) গবেষক পিটার ডি ওয়েজম্যান বলেন, ইউরোপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অস্ত্রের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

জার্মান অর্থনীতির ঐতিহ্যগত শক্তি ছিল গাড়ি ও রপ্তানিনির্ভর শিল্প। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিরক্ষা খাত দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, অন্যদিকে প্রতিরক্ষা শিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব—দুইয়ের সমন্বয়ে জার্মানি অস্ত্র রপ্তানি বাড়ানোর পথে এগোচ্ছে। তবে একই সঙ্গে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের আশঙ্কা নিয়ে বিতর্কও অব্যাহত রয়েছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন