- ২৭ জুলাই, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
ইসরায়েলের সঙ্গে একটি নিরাপত্তা চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে সিরিয়া। দেশটির প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা জানিয়েছেন, কয়েকটি দেশের অংশগ্রহণে এ বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, এই চুক্তি ভবিষ্যতে একটি বৃহত্তর ও পূর্ণাঙ্গ শান্তি সমঝোতার পথ তৈরি করতে পারে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ‘আল মুকাবালা’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে আল-শারা এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটির পূর্ণাঙ্গ অংশ পরে প্রচার হওয়ার কথা রয়েছে।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্ভাব্য নিরাপত্তা চুক্তি দেশের স্বার্থ ও অধিকার ক্ষুণ্ন করবে না। বিশেষ করে গোলান মালভূমির ওপর সিরিয়ার দাবির বিষয়টি কোনোভাবেই পরিত্যাগ করা হবে না। উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সালের পর থেকে গোলান মালভূমির বড় অংশ ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত।
আল-শারা বলেন, সিরিয়া বর্তমানে ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলার নীতি অনুসরণ করছে। একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি হলে তা আঞ্চলিক উত্তেজনা কমিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমাধানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সিরিয়ার নতুন নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসার পর দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের একাধিক সামরিক অভিযান ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদের সরকারের পতনের পর আল-শারা দেশটির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
সাক্ষাৎকারে লেবানন ইস্যুতেও নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট। তিনি জানান, প্রতিবেশী দেশটিতে কোনো ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা নেই দামেস্কের।
আল-শারা বলেন, লেবাননের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় দেশটির কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করার পথ খুঁজছে সিরিয়া। তিনি মনে করেন, লেবাননে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে শুধু নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকসহ একটি সমন্বিত সমাধান।
তিনি আরও সতর্ক করেন, লেবাননে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে সিরিয়ার ওপরও। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়লে পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আল-শারা জানান, যুদ্ধ ও শান্তির সিদ্ধান্ত কেবল লেবাননের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হাতেই থাকা উচিত। তিনি দেশটির অভ্যন্তরে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
বর্তমানে দক্ষিণ লেবানন নিয়ে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা চলছে। ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু এলাকা পুনরুদ্ধার এবং দেশের সব অস্ত্র রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অধীনে আনার চেষ্টা করছে বৈরুত সরকার।
সিরিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন আল-শারা। তিনি বলেন, শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সিরিয়াকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষক দেশের তালিকা থেকেও সরাতে হবে।
তার মতে, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় স্বাভাবিকভাবে ফিরতে হলে সিরিয়ার বিরুদ্ধে থাকা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাধাগুলোও দূর করা প্রয়োজন।
উত্তর ও পূর্ব সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)-এর সঙ্গে করা চুক্তির বিষয়েও মন্তব্য করেন আল-শারা।
তিনি জানান, চুক্তি বাস্তবায়নে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে সরকার এখনো এই সমঝোতার প্রতি পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এর সফল বাস্তবায়নের ব্যাপারে আশাবাদী।
সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে সরকার। আল-শারা জানান, ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়া মানুষদের তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধানে এই কমিটি কাজ করবে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সিরিয়ার যুদ্ধে প্রায় এক লাখ মানুষ জোরপূর্বক নিখোঁজ হয়েছেন। তবে দেশটির নিখোঁজ ব্যক্তিবিষয়ক জাতীয় কমিশনের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা তিন লাখ পর্যন্ত হতে পারে।
আল-শারা বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে কাজ করবে এই কমিটি এবং এ বিষয়ে অভিজ্ঞ দেশগুলোর সহযোগিতাও নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা সমঝোতার উদ্যোগ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বার্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা—সব মিলিয়ে নতুন সিরীয় নেতৃত্ব কূটনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।