- ১২ জুন, ২০২৬
PNN বিশেষ প্রতিবেদনঃ আরাফাত হাবিব
১৯৩৮ সালের জুন মাস। ইউরোপ তখন এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে। একদিকে ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তেজনা, অন্যদিকে ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে যুদ্ধের আশঙ্কা। জার্মানির সম্প্রসারণবাদী নীতি, স্পেনের গৃহযুদ্ধ, ইউরোপজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে মহাদেশজুড়ে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ। কিন্তু এই উত্তাল সময়েই ফ্রান্সে আয়োজন করা হয় ফুটবল বিশ্বকাপের তৃতীয় আসর। পরে ইতিহাস প্রমাণ করেছে, এটি শুধু একটি বিশ্বকাপ ছিল না; এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের শেষ বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া উৎসব।
ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে ৪ জুন থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টে অংশ নেয় ১৫টি দেশ। মূলত ১৬টি দল খেলার কথা থাকলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক পরিবর্তন ঘটে। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল অস্ট্রিয়ার অনুপস্থিতি। বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র কয়েক মাস আগে নাৎসি জার্মানি অস্ট্রিয়াকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে নেয়। সেই সময় অস্ট্রিয়া ছিল ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল। তাদের ‘ভুন্ডারটিম’ বা ‘বিস্ময়কর দল’ নামে ডাকা হতো। কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে সেই দলটি বিশ্বকাপ থেকেই হারিয়ে যায়। অনেক খেলোয়াড়কে জার্মান দলে নেওয়া হলেও মাঠে সেই সমন্বয় সফল হয়নি।
টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই আরেকটি বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল আয়োজক নির্বাচন নিয়ে। ১৯৩০ সালে উরুগুয়ে এবং ১৯৩৪ সালে ইতালির পর এবারও বিশ্বকাপ চলে যায় ইউরোপে। এতে ক্ষুব্ধ হয় দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা মনে করেছিল, এবার তাদের আয়োজক হওয়ার সুযোগ ছিল। প্রতিবাদ হিসেবে আর্জেন্টিনা দল পাঠায়নি। প্রথম বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েও আগের ক্ষোভ ভুলতে পারেনি। ফলে টানা দ্বিতীয়বারের মতো তারা বিশ্বকাপ বর্জন করে। বিশ্ব ফুটবলের দুই গুরুত্বপূর্ণ শক্তিকে ছাড়াই শুরু হয় তৃতীয় বিশ্বকাপ।
তৎকালীন বিশ্বকাপের নিয়মও ছিল বর্তমান সময়ের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো গ্রুপপর্ব ছিল না। প্রথম ম্যাচেই হার মানে বিদায়। ফলে টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই প্রতিটি ম্যাচ ছিল কার্যত ফাইনালের সমান গুরুত্বপূর্ণ। খেলোয়াড়দের ওপর মানসিক চাপও ছিল অনেক বেশি। এক মুহূর্তের ভুল পুরো বিশ্বকাপ শেষ করে দিতে পারত।
শিরোপাধারী ইতালি ফ্রান্সে আসে আত্মবিশ্বাসী একটি দল হিসেবে। কোচ ভিত্তোরিও পোৎসো ইতোমধ্যেই ইউরোপের অন্যতম সেরা কৌশলবিদ হিসেবে পরিচিত। তার দল শুধু শক্তিশালীই ছিল না, ছিল অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ। ইতালির ফুটবলে তখন কৌশল, রক্ষণ এবং দলগত সমন্বয়ের এক অনন্য মিশ্রণ দেখা যাচ্ছিল। অন্যদিকে হাঙ্গেরি, ব্রাজিল, চেকোস্লোভাকিয়া এবং স্বাগতিক ফ্রান্সও শিরোপার দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।
প্রথম রাউন্ড থেকেই বিশ্বকাপ জমে ওঠে। ব্রাজিল এবং পোল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচটি আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর ম্যাচ হিসেবে বিবেচিত হয়। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ শেষ হয়েছিল ৪–৪ সমতায়। অতিরিক্ত সময়ে আরও দুই গোল করে ব্রাজিল ৬–৫ ব্যবধানে জয় পায়। ম্যাচটিতে ব্রাজিলের লিওনিদাস দা সিলভা তিনটি গোল করেন। সেই ম্যাচের পরই ইউরোপের সংবাদপত্রগুলো তাকে নিয়ে লেখা শুরু করে। ব্রাজিল তখনও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়নি, কিন্তু এই ম্যাচের পর বিশ্ব বুঝতে শুরু করে, ফুটবলে নতুন এক শক্তির জন্ম হচ্ছে।
লিওনিদাস ছিলেন এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ফুটবলার। তাকে বলা হতো ‘কালো হীরা’। তার গতি, কৌশল, বল নিয়ন্ত্রণ এবং অপ্রত্যাশিত আক্রমণ প্রতিপক্ষের জন্য ছিল বড় আতঙ্ক। অনেক ফুটবল ইতিহাসবিদ মনে করেন, আধুনিক ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সৌন্দর্য ও সৃজনশীলতার প্রথম বিশ্বব্যাপী পরিচয় ঘটে এই বিশ্বকাপেই। সাত গোল করে তিনি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন এবং বিশ্ব ফুটবলের প্রথম দিককার সুপারস্টারদের একজন হিসেবে পরিচিতি পান।
অন্যদিকে ইতালিও এগিয়ে যাচ্ছিল নিজেদের স্বভাবসুলভ দৃঢ়তায়। নরওয়ের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে তাদের অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত খেলতে হয়। পরে স্বাগতিক ফ্রান্সকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে তারা। কিন্তু মাঠের বাইরের গল্পও তখন সমানভাবে আলোচনায় ছিল। ইতালির খেলোয়াড়রা ম্যাচের আগে ফ্যাসিবাদী সালাম দিতেন, যা অনেক দর্শকের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। ফ্রান্সের স্টেডিয়ামগুলোতে অনেক সময় ইতালির জাতীয় সংগীতের সময়ও দুয়ো শোনা যেত। তবুও মাঠে ইতালির খেলোয়াড়রা ছিলেন অবিচল।
সেমিফাইনালে ইতালির প্রতিপক্ষ ছিল ব্রাজিল। অনেকেই এই ম্যাচকে প্রকৃত ফাইনাল বলে মনে করেছিলেন। কারণ দুই দলই ছিল দুর্দান্ত ফর্মে। তবে ম্যাচের আগে ব্রাজিল একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। দলের প্রধান তারকা লিওনিদাসকে বিশ্রাম দেওয়া হয়, কারণ কোচিং স্টাফ ধরে নিয়েছিল তারা ফাইনালে উঠবেই। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই কাল হয়ে দাঁড়ায়। ইতালি সুযোগ কাজে লাগিয়ে ২–১ ব্যবধানে জয় পায় এবং ফাইনালে পৌঁছে যায়। ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যম বহু বছর ধরে এই সিদ্ধান্তকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় কৌশলগত ভুল হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অন্য সেমিফাইনালে হাঙ্গেরি শক্তিশালী সুইডেনকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে। পুরো টুর্নামেন্টে হাঙ্গেরির আক্রমণভাগ ছিল দুর্দান্ত। তাদের খেলা দেখে অনেকেই মনে করেছিলেন, তারাই হয়তো ইতালির আধিপত্য ভাঙতে পারবে।
১৯ জুন প্যারিসের উপকণ্ঠে কোলম্বেস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনাল ঘিরে তৈরি হয়েছিল তীব্র উত্তেজনা। প্রায় ৬০ হাজার দর্শকে পূর্ণ স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল দেখা যায়। মাত্র ছয় মিনিটেই ইতালি এগিয়ে যায়। এরপর হাঙ্গেরি সমতা ফেরালেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় ইতালিয়ানরা। সিলভিও পিওলা ও জিনো কোলাউসির দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ইতালি ৪–২ ব্যবধানে জয় তুলে নেয়।
ফাইনালের পর একটি ঘটনা আজও ফুটবল ইতিহাসে আলোচিত। ইতালির খেলোয়াড়রা দাবি করেছিলেন, মুসোলিনি তাদের কাছে একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা পাঠিয়েছিলেন—“জয়ী হও, নতুবা...”। যদিও এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবুও এটি বিশ্বকাপের অন্যতম বিখ্যাত কাহিনিতে পরিণত হয়েছে।
এই জয়ের মাধ্যমে ইতালি প্রথম দল হিসেবে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়ে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রায় এক দশক পর যখন বিশ্বকাপ আবার মাঠে গড়ায়, তখনও ইতালিই ছিল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। কারণ ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালের বিশ্বকাপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বাতিল হয়ে যায়। ফলে ১৯৩৮ সালের সেই শিরোপা কার্যত ১২ বছর ইতালির কাছেই ছিল।
আজ প্রায় নব্বই বছর পর ফিরে তাকালে ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপকে শুধু একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ছিল এমন একটি টুর্নামেন্ট, যেখানে ফুটবল, রাজনীতি, জাতীয় পরিচয় এবং ইতিহাস এক সুতোয় গাঁথা হয়ে গিয়েছিল। এটি ছিল যুদ্ধের আগমুহূর্তে বিশ্বের শেষ আনন্দ-উৎসব, যেখানে একদিকে ইতালি তাদের সোনালি যুগের পূর্ণতা পেয়েছিল, অন্যদিকে ব্রাজিল প্রথমবারের মতো বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিল—একদিন ফুটবল বিশ্ব তাদের পায়ের নিচেই ঘুরবে।
আর সেই কারণেই ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপ শুধু একটি শিরোপা জয়ের গল্প নয়; এটি বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এক যুগের সমাপ্তি এবং আরেক যুগের সূচনার দলিল।