- ১২ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছে ইরান। দেশটির নতুন সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল প্রধান মোহসেন রেজাই জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান ও ইরানের বন্দর ঘিরে নৌ অবরোধ বন্ধ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলবে না তেহরান। একই সঙ্গে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের অর্থ ছাড় এবং গাজা ও লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতির দাবিও জানিয়েছে দেশটি।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসেন নাকভির তেহরান সফরের মধ্যেই ইরানের পক্ষ থেকে এ অবস্থান জানানো হয়। চলমান সংঘাতের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে পাকিস্তান মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়েছে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানা গেছে, চীনের রাষ্ট্রদূত কং পেইউয়ের সঙ্গে বৈঠকে মোহসেন রেজাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার বর্তমান নীতি পরিবর্তন করে ইরানের শর্ত মেনে না নেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা হবে না।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টেও একই বার্তা দেন রেজাই। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ ও ইরানের বন্দর অবরোধ বন্ধ করতে হবে, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের সম্পদ ছাড়তে হবে এবং গাজা ও লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে হবে। এসব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রণালি বন্ধই থাকবে বলে জানান তিনি।
এদিকে তেহরানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করেছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসেন নাকভি। বৈঠকে দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়।
সংঘাতের অবসানে ইসলামাবাদের মধ্যস্থতার উদ্যোগের অংশ হিসেবেই নাকভির এই সফর বলে জানা গেছে।
এর আগে কাতারও জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, প্রণালি পুনরায় চালু করা, যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং আলোচনার পথ এগিয়ে নেওয়াই এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।
তবে ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের পথ নিয়ে ওমানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হলেও তা প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে না।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যালান আইরির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ বাড়াতেই ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখছে। তার ভাষায়, ভবিষ্যতে ইরানের ওপর নতুন করে হামলা ঠেকাতে নিজেদের কৌশলগত প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে তেহরান।
যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে আলোচনার অগ্রগতির কথা বললেও অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুমকিও দিয়ে আসছেন।
সোমবার রাতে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছেন। তবে একই সঙ্গে তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হতে দেওয়ার অথবা আরও কঠোর সামরিক হামলা চালানোর সম্ভাবনার কথাও জানান তিনি।
এ অবস্থায় যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সংঘাতের প্রভাব এরই মধ্যে হরমুজের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ওমান উপসাগরে পানামার পতাকাবাহী একটি পণ্যবাহী জাহাজ থামাতে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি MH-60 হেলিকপ্টার থেকে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। মার্কিন বাহিনীর দাবি, জাহাজটি ইরানের বন্দর ঘিরে দেওয়া নৌ অবরোধ লঙ্ঘন করছিল এবং বারবার সতর্ক করার পরও থামেনি।
অন্যদিকে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে একটি ছোট পণ্যবাহী জাহাজে সন্দেহভাজন হুথি হামলায় চার নাবিক নিহত হয়েছেন বলে ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া ইরানবিরোধী সামরিক গোষ্ঠীর দুই ইয়েমেনি সদস্যও নিহত হয়েছেন বলে দেশটির কোস্টগার্ড জানিয়েছে।
মিশরের মালিকানাধীন ‘তিহামাহ’ নামের জাহাজে এ হামলা হয়ে থাকলে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জাহাজ চলাচলের ওপর হুথিদের হামলায় এটিই প্রথম প্রাণহানির ঘটনা হবে।
হুথি নিয়ন্ত্রিত সংবাদ সংস্থা সাবা জানিয়েছে, বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী একটি সৌদি জাহাজেও হামলা চালানো হয়েছে। তবে জাহাজটির নাম প্রকাশ করা হয়নি এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে সংঘাত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ইরানও ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের হিসাবে দেশটিতে এ পর্যন্ত অন্তত ৩ হাজার ৫২৭ জন নিহত এবং ২৭ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৮ নাগরিকও প্রাণ হারিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে সংঘাতের প্রভাব লেবাননেও তীব্র হয়েছে। ইরানসমর্থিত হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা চালানোর পাশাপাশি ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননে প্রায় প্রতিদিনই হামলা চালাচ্ছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে দেশটিতে ৪ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ১২ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। ইরান ও হিজবুল্লাহর হামলায় ইসরায়েলেও অন্তত ৬০ জন নিহত হয়েছেন।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থা পরিচালিত হওয়ায় প্রণালিটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক তেলবাজার, জাহাজ চলাচল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে ইরানের শর্ত, পাকিস্তান-কাতারের মধ্যস্থতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে এখন নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল।