Tuesday, August 11, 2026

ইরান যুদ্ধের আঁচে বিপর্যস্ত ইরাকের কুর্দিস্তান, বাণিজ্য কমেছে ৭০ শতাংশ


ছবিঃ ইরাকের ইরবিলে একটি কুর্দি পতাকার কাছে বাজারে মানুষজন হাঁটাহাঁটি করছেন (সংগৃহীত । আল জাজিরা /আলা আল-মারজানি/রয়টার্স)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN 

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান যুদ্ধে সরাসরি পক্ষ না হয়েও এর ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে। গত পাঁচ মাসে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকটেও পড়েছে অঞ্চলটি। কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের (কেআরজি) প্রধানমন্ত্রী মাসরুর বারজানি জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে অঞ্চলটির বাণিজ্য প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে।

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বারজানি বলেন, ইরান থেকে সরাসরি কিংবা ইরাকের ভেতর থেকে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে কুর্দিস্তান অঞ্চলে এক হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। এসব হামলায় হতাহতের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তার ভাষায়, কুর্দিস্তান কোনো পক্ষের হয়ে যুদ্ধে অংশ নেয়নি এবং নিজেদের ভূখণ্ডকে ইরানে হামলার ঘাঁটি হিসেবেও ব্যবহার করতে দেয়নি। তারপরও অঞ্চলটিকে হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে হয়েছে।

কেআরজির তথ্য অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্য ছিল সামরিক ও নিরাপত্তা স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো, ঘাঁটি এবং ইরানি কুর্দি বিরোধী দলগুলোর বিভিন্ন কার্যালয়। পাশাপাশি বেসামরিক এলাকাতেও হামলার প্রভাব পড়েছে।

যুদ্ধের প্রভাবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে অর্থনীতিতে। তেল ও গ্যাস খাত, ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনিতেই বাগদাদে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বেতন, তেল বিক্রি ও রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধে আর্থিক সংকটে রয়েছে কুর্দিস্তান।

কেআরজির মুখপাত্র পেশাওয়া হাওরামানি জানান, এপ্রিল পর্যন্ত যুদ্ধের কারণে কুর্দিস্তান অঞ্চলের ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি ইরাকি দিনার, যা প্রায় ১১৪ কোটি মার্কিন ডলারের সমান। ক্ষয়ক্ষতির এই হিসাব ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেও দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, কুর্দিস্তান এই যুদ্ধে কোনো পক্ষ ছিল না এবং ইরানে হামলা চালানোর জন্য নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করার সুযোগও দেয়নি। ফলে অঞ্চলটিতে হামলার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

কুর্দি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ইরান-সমর্থিত কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী কুর্দিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। এসব গোষ্ঠীর নাম ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকারকে জানানো হলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছে কেআরজি।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও কেআরজির পেশমার্গা মন্ত্রণালয়ের সাবেক মহাসচিব জাব্বার ইয়াওয়ার বলেন, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ধারাবাহিক হামলা কুর্দিস্তানের নিরাপত্তাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

তার দাবি, অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি সশস্ত্র গোষ্ঠী অঞ্চলটিতে হামলায় জড়িত। এসব হামলার অনেকগুলোই নিনেভেহ সমভূমি, কিরকুকের আশপাশ এবং সালাহ আল-দিন এলাকা থেকে পরিচালিত হচ্ছে।

এদিকে কুর্দিস্তান ও ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ণাঙ্গ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় হামলা ঠেকানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

নিরাপত্তা সংকটের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিও ইরাকের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। নৌ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় দেশটির অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিদেশি কোম্পানিগুলোর পরিচালিত সব তেলক্ষেত্রে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করে ইরাকের তেল মন্ত্রণালয়।

তেল রপ্তানি বন্ধ থাকায় সরকারের রাজস্ব দ্রুত কমে গেছে। একই সময়ে তেলনির্ভরতা কমাতে এবং অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পরিকল্পনাও বাধার মুখে পড়েছে।

অর্থনীতিবিদ আলান্দ কারিম সালিহ বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কুর্দিস্তানের তেল ও গ্যাস খাত সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ইরানি হামলার কারণে খোর মোর গ্যাসক্ষেত্রে কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় কুর্দিস্তান অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহেও প্রভাব পড়েছে।

তিনি জানান, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন দুই লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির লক্ষ্য থাকলেও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে উৎপাদন কমে প্রায় ৩০ হাজার ব্যারেলে নেমেছে। পরিস্থিতির সঙ্গে এই পরিমাণ পরিবর্তিত হচ্ছে।

যুদ্ধের আগে থেকেই কুর্দিস্তান অঞ্চলে আর্থিক সংকট চলছিল। যুদ্ধের পর অঞ্চলটির অ-তেল রাজস্বও প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে বলে জানিয়েছেন সালিহ। এতে সরকারি দপ্তরগুলোর মৌলিক ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

শুধু জ্বালানি ও বাণিজ্য নয়, যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে আবাসন খাতেও। অঞ্চলটিতে আবাসন সম্পত্তির দাম প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে অর্থনৈতিক গবেষকদের দাবি।

এর ফলে এরবিল, সুলাইমানিয়া ও দোহুকের মতো প্রধান শহরগুলোতে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত বা বিস্তৃত হলে কুর্দিস্তান অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের একদিকে এবং ইরান ও তার সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর অন্যদিকে সংঘাতের স্থায়ী ময়দানে পরিণত হতে পারে।

কুর্দিস্তান সরকার অবশ্য শুরু থেকেই এই সংঘাতের বাইরে থাকার অবস্থান জানিয়ে আসছে। তবে হামলা ও অর্থনৈতিক চাপ একসঙ্গে বাড়তে থাকায় সেই অবস্থান কতটা ধরে রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়েই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন