- ১১ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
ড্রোন হামলার পর লিবিয়ার জাওয়িয়া তেল শোধনাগারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দেশটির সবচেয়ে বড় চালু তেল শোধনাগারটিতে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে মঙ্গলবারও দমকলকর্মীরা কাজ করছেন। হামলা অব্যাহত থাকলে শোধনাগারের কার্যক্রম বন্ধ করে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে লিবিয়ার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশন (এনওসি)।
লিবিয়ার অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। বেশির ভাগ মানুষ ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টের কারণে চিকিৎসা নিয়েছেন।
আল জাজিরার যাচাই করা ভিডিওতে শোধনাগারটির ওপর বিশাল আগুনের শিখা ও ঘন কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। রাজধানী ত্রিপোলি থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত জাওয়িয়া শোধনাগারটির দৈনিক পরিশোধন সক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল।
লিবিয়ার ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশন জানায়, সোমবার সন্ধ্যায় শোধনাগারের বেগা অয়েল কোম্পানির নিয়ন্ত্রণাধীন ৪০২-টি নম্বর একটি তেলের ট্যাংকে হামলার পর আগুনের সূত্রপাত হয়। ওই ট্যাংকে প্রায় ৪৫ লাখ লিটার পেট্রোল মজুত ছিল।
এনওসির ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রোনের সরাসরি আঘাতে ট্যাংকটিতে তীব্র আগুন ধরে যায় এবং পরে সেটি পুরোপুরি ধসে পড়ে।
তবে এটি ওই স্থাপনায় সাম্প্রতিক একমাত্র হামলা নয়। এনওসি জানিয়েছে, রোববার শোধনাগারের একটি পানি শোধনাগার কেন্দ্রে এবং শনিবার ন্যাফথা সংরক্ষণাগারে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে।
পরপর হামলার পর ওই এলাকায় সর্বোচ্চ মাত্রার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে এনওসি। একই সঙ্গে হামলার তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টা পর এনওসি জানায়, জাওয়িয়া শোধনাগারে নাশকতামূলক হামলা এখনো বন্ধ হয়নি। একটি ড্রোন শোধনাগারের তেল মিশ্রণ ও বোতলজাতকরণ স্থাপনার দিকে হামলা চালায়।
ড্রোনটি প্রধান তেল সংরক্ষণ ট্যাংক ও অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য তেল উৎপাদনে ব্যবহৃত পাইপলাইন নেটওয়ার্কের কাছাকাছি গিয়ে পড়ে। তবে এতে হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
এনওসির পরিচালনা পর্ষদ সতর্ক করে বলেছে, হামলা অব্যাহত থাকলে শোধনাগারের কার্যক্রম স্থগিত করে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ থাকবে না।
বেগা অয়েল কোম্পানিও সব পক্ষকে সংঘাত বন্ধ করে তেল স্থাপনা ও সংরক্ষণাগার থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তেল স্থাপনাগুলো পুরো লিবিয়ার জনগণের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। এগুলো রক্ষা করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব।
এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী এসব ড্রোন হামলার দায় স্বীকার করেনি। হামলার পেছনে কারা রয়েছে, সে বিষয়ে এনওসিও কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেয়নি।
লিবিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক বিভাজন ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাবের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলার ঘটনা ঘটল। ২০২০ সালের যুদ্ধবিরতির পর বড় ধরনের সংঘাত অনেকটা থেমে গেলেও দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি।
২০১৪ সাল থেকে দেশটি কার্যত রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। বর্তমানে রাজধানী ত্রিপোলিভিত্তিক জাতিসংঘ-সমর্থিত সরকারের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী আবদুল হামিদ দেইবাহ। অন্যদিকে দেশটির পূর্বাঞ্চলে সামরিক কমান্ডার খলিফা হাফতারের সমর্থিত একটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রশাসন রয়েছে।
জাওয়িয়া শোধনাগারে হামলার পর ত্রিপোলিভিত্তিক সরকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেছে। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ রাজধানীর কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রধানরাও অংশ নেন বলে সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী দেইবাহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করে এমন যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
এদিকে লিবিয়ার পার্লামেন্টের একটি কমিটিও জাওয়িয়া শোধনাগারে হামলার নিন্দা জানিয়েছে। জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদবিষয়ক কমিটি এক বিবৃতিতে বলেছে, দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি তেল ও গ্যাস খাতের এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তেল স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে তারা।