- ১১ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
কলম্বিয়ায় চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৩২ জনে দাঁড়িয়েছে। ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী এই ভূমিকম্পে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অনেকে আটকে থাকতে পারেন এমন আশঙ্কায় মঙ্গলবারও রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে কালি ও পেরেইরা। এসব শহরে সেনাসদস্য, দমকলকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও জরুরি বিভাগের কর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কোনো শব্দ পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা শুনতে মাঝেমধ্যে উদ্ধারকাজ থামিয়ে দিচ্ছেন তারা।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কালিতে অন্তত ৩৫ জন এবং রিসারালদা অঞ্চলে ৪০ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া চোকো অঞ্চলে নয়জন, কালদাসে দুজন এবং আন্তিওকিয়া অঞ্চলে ৭৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর প্রাথমিকভাবে ৮৭ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও পরে প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা জানান, শুধু ভায়া দেল কাউকা এলাকাতেই আহতের সংখ্যা প্রায় ৭০০।
দেশটির বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৬০০ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ঐতিহাসিক মানিজালেস ক্যাথেড্রালের কয়েকটি অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কালির একটি হাসপাতালে ওপরের কয়েকটি তলা ধসে পড়েছে। এর মধ্যে শিশুদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত অংশও ছিল। এতে কিছু রোগী আটকা পড়েন এবং প্রায় ৬০০ রোগীকে হাসপাতালের বাইরে ধ্বংসস্তূপে ঘেরা সড়কে চিকিৎসা দিতে হয়।
এদিকে নাগরিক উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন ওয়েবসাইটে সোমবার রাত পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৭০০ মানুষের নিখোঁজ হওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হলেও এসব সংখ্যা যাচাই করা হয়নি। ফলে প্রকৃত নিখোঁজের সংখ্যা কত, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
কালিতে স্বেচ্ছাসেবকরা মানবশৃঙ্খল তৈরি করে হাতে হাতে ইট, কংক্রিট ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন। একটি ধসে পড়া ভবন থেকে দুই নারী ও দুই শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দমকল বাহিনী।
পেরেইরায় একটি বেকারির ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা এক শিশুর সঙ্গে উদ্ধারকারীরা যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছেন। শিশুটিকে বের করে আনতে একই সঙ্গে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের অংশ সরানোর কাজ চলছে।
দুর্গম চোকো অঞ্চলেও উদ্ধারকারী দল, প্রকৌশলী ও প্রশিক্ষিত কুকুর পাঠানো হয়েছে। তবে অঞ্চলটির অনেক জায়গায় সড়ক যোগাযোগ সীমিত হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল হিসেবে সান হোসে দেল পালমার এলাকার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)।
কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক পরিষেবা জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর সোমবার রাত পর্যন্ত অন্তত ২১টি পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে। আরও কম্পন হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের ভয়াবহতার পর দেশজুড়ে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে কলম্বিয়া সরকার। প্রেসিডেন্ট দে লা এসপ্রিয়েলা কুইবদো ও কালি পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির বাসিন্দাদের ভাড়া সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
লুটপাটের আশঙ্কায় কালি ও পেরেইরায় রাতে কারফিউ জারি করা হয়েছে। কালি, আরমেনিয়া ও মানিজালেসেও রাতের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। একই সঙ্গে পাঁচটি শহরের হাসপাতালকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
ভবনগুলোর কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষা করতে পেরেইরা, মানিজালেস, কুইবদো, আরমেনিয়া, কার্তাগো ও বুয়েনাভেন্তুরার বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
উদ্ধারকাজে স্থানীয় বাসিন্দারাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। অনেকে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকর্মীদের সহযোগিতা করছেন।
ভূমিকম্পের পর কলম্বিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্র জরুরি ত্রাণ, খাদ্য ও আশ্রয় ব্যবস্থার জন্য ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন হলে আরও সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য তাদের কোপার্নিকাস স্যাটেলাইট পরিষেবা সক্রিয় করেছে।
এ ছাড়া এল সালভাদর ও মেক্সিকোও উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসাকর্মী, প্যারামেডিক, ত্রাণসামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ মাত্রা এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দেশটির কর্মকর্তারা।