Wednesday, August 12, 2026

ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগ নিয়ে ১৮ উপজেলায় উত্তেজনা, কোথাও ভাঙচুর কোথাও তালা


ছবিঃ বিভিন্ন উপজেলা ইউএনওয়ের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা 

ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬-এর তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ তুলে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ, মানববন্ধন, কার্যালয় ঘেরাও ও তালা দেওয়ার মতো কর্মসূচি পালন করেছেন। কোথাও কোথাও সরকারি কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৮টি উপজেলায় নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও অন্য কর্মকর্তাদের অপসারণের দাবিও উঠেছে। কোথাও কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ এসেছে, আবার কোথাও নিয়োগে ক্ষোভ জানিয়ে রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা পদত্যাগও করেছেন।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে গাইবান্ধার ফুলছড়িতে। সেখানে নিয়োগের ফল প্রকাশের পর ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মী ও নিয়োগে বাদ পড়া ব্যক্তিরা উপজেলা পরিষদে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে ইউএনওর কার্যালয়ের একটি কক্ষের জানালা এবং বারান্দায় থাকা চেয়ার ও ফুলের টব ভাঙচুর করা হয়।

উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জয়নাল মিয়া দাবি করেন, নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকায় দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁর নিজের নামও তালিকায় না থাকায় তিনি ক্ষুব্ধ বলে জানান। তবে ফুলছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুরুল হোদা জানিয়েছেন, ভাঙচুরের ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা বা লিখিত অভিযোগ হয়নি।

ফুলছড়ির ইউএনও মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঘটনার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। অভিযোগ ও তথ্য যাচাই করে পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফুলছড়ির পাশাপাশি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, পলাশবাড়ী ও সাদুল্লাপুরেও নিয়োগ নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। সুন্দরগঞ্জে বিক্ষোভকারীরা উপজেলা ইউএনওর কার্যালয় এবং সমাজসেবা কার্যালয়ের দরজায় তালা ঝুলিয়ে দেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলির দাবিও জানানো হয়।

সুন্দরগঞ্জের ইউএনও ঈফফাত জাহান তুলি জানান, তাঁর কার্যালয়ে ভাঙচুর হয়নি, তবে তালা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

পলাশবাড়ীতে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিলের পর সড়ক অবরোধ করেন। সেখানে ইউএনও ও জেলা প্রশাসকের অপসারণের দাবিও ওঠে। অন্যদিকে সাদুল্লাপাড়ায় ইউএনও কার্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে নিয়োগের ফল বাতিল করে নতুন করে প্রক্রিয়া শুরুর দাবি জানানো হয়।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নিয়োগে দলীয় নেতা-কর্মীদের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগ তুলে ইউএনও ও উপজেলা প্রশাসক মো. কায়েসুর রহমানকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক যুবদল নেতার বিরুদ্ধে। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ওই ব্যক্তি আরেকটি ভিডিওতে নিজের বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।

ইউএনও কায়েসুর রহমান বলেন, তিনি পরবর্তী বক্তব্যে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলে বিষয়টি নিয়ে আপাতত আর মন্তব্য করতে চান না।

রাজশাহীর বাগমারাতেও নিয়োগ নিয়ে বিক্ষোভের সময় ইউএনওকে লক্ষ্য করে আপত্তিকর ও হুমকিমূলক স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ইউএনও সেলিম আহমেদ জানিয়েছেন, এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে বিএনপি, ছাত্রদল এবং নিয়োগবঞ্চিত ব্যক্তিরা উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে ইউএনও কার্যালয়, সমাজসেবা কার্যালয়, শিক্ষা অফিস ও এলজিইডিসহ কয়েকটি সরকারি দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

বিক্ষোভকারীরা বিতর্কিত ফল বাতিল করে নতুন করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অপসারণের দাবি জানান। দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুমকিও দেওয়া হয়।

পাবনার সাঁথিয়া, কুষ্টিয়ার কুমারখালী, রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও গৌরীপুরসহ আরও কয়েকটি উপজেলায় নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ হয়েছে। কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, আবার কোথাও লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া ব্যক্তির নাম তালিকায় থাকার দাবি করা হয়েছে।

যশোরের ঝিকরগাছায় ভাইভায় অংশ না নেওয়া এক ব্যক্তির নাম চূড়ান্ত তালিকায় আসার অভিযোগ ওঠে। পরে প্রশাসন সংশোধনী বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তাঁর ফল বাতিল করে। ঘটনাটিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘তথ্যগত ত্রুটি’ বলা হলেও নিয়োগপ্রত্যাশীদের একাংশ পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে উপজেলা ছাত্রদলসহ কয়েকটি সংগঠন ইউএনও কার্যালয় ঘেরাও করে। সেখানে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে কর্মকর্তার অপসারণের দাবিও জানানো হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

ময়মনসিংহের গৌরীপুরেও নিয়োগের তালিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, যোগ্যতা ও পদ অনুযায়ী নিয়োগ না দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়েছে। তবে নিয়োগ কমিটির সভাপতি আফিয়া আমীন পাপ্পা বলেন, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিধি অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন উপজেলার কয়েকজন ইউএনও নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সরকারি প্রকল্পে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে লোক নিয়োগের জন্য তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তারা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন বলে দাবি করেন।

একজন ইউএনও বলেন, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী নিয়োগ দিতে গিয়ে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। চাপের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই তাঁর কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. বাবুল মিঞা বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর বা সহিংসতার কোনো সুযোগ নেই। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদেরও আইন, বিধি ও নীতিমালা অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

তিনি বলেন, প্রকৃত যোগ্যতা ও প্রাপ্যতার ভিত্তিতে সরকারি নীতিমালা নিরপেক্ষভাবে বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মতো একটি জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম শুরুতেই নিয়োগ নিয়ে বিতর্কে পড়ায় এর বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে মাঠ প্রশাসনে চাপ ও অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন