- ১২ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেরিকোর দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে একসময় যেখানে ছিল বসতবাড়ি, বাগান ও পারিবারিক আঙিনা, সেখানে এখন পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের নেতৃত্বে ধারাবাহিকভাবে বাড়িঘর ও স্থাপনা ভেঙে ফেলা হচ্ছে। ধ্বংসাবশেষ মাটিচাপা দিয়ে জমি সমতল করার পাশাপাশি সেখানে কৃষিকাজের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
আইনজীবী, স্থানীয় বাসিন্দা ও অধিকারকর্মীদের বক্তব্য এবং ইসরায়েলি রাষ্ট্রের আদালতে দেওয়া নথি ঘেঁটে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেরিকোর আইন আল-দুয়ুক এলাকায় এই ঘটনাকে ঘিরে বসতিস্থাপনকারী ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা খলিল আল-রাজিম বলেন, তার প্রতিবেশী মোহাম্মদ সালাহর বাড়ির প্রবেশপথের সামনে দুই মিটারেরও বেশি উঁচু ধ্বংসাবশেষ ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে সালাহকে নিজের বাড়িতে ঢুকতে এখন দেয়াল টপকাতে হচ্ছে।
সালাহর দাবি, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বসতিস্থাপনকারীদের হামলার সময় তার বাড়ির একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে একই এলাকায় ধ্বংসাবশেষ সরানোর নামে আবারও বুলডোজার নিয়ে কাজ শুরু হয়। তবে সেই কাজের সময় তার বাড়ির সামনে আরও ধ্বংসাবশেষ ফেলে দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৯ জুলাই থেকে প্রায় প্রতিদিনই বসতিস্থাপনকারীদের ব্যবহৃত খননযন্ত্র ওই এলাকায় যাচ্ছে। বাইরে থেকে বলা হচ্ছে, উদ্দেশ্য শুধু ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করা। কিন্তু বাসিন্দাদের অভিযোগ, এরই মধ্যে বাড়িঘর, বাগান, গাছপালা ও চলাচলের পথ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী হানান হার্বস্ট। তার পরিচালিত একটি বসতি ২০২৪ সালে এলাকায় গড়ে ওঠে। প্রথমদিকে সেটি ইসরায়েলের নিজস্ব নিয়মেও অনুমোদনহীন ছিল। পরে চলতি বছরের মার্চে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা সেটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বসতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
বাসিন্দারা বলছেন, হার্বস্ট যখনই ভারী যন্ত্র নিয়ে এলাকায় প্রবেশ করেন, তখন তার সঙ্গে ইসরায়েলি সেনারাও থাকে। তবে বাড়িঘর ভাঙার অনুমোদনসংক্রান্ত কোনো লিখিত আদেশ তাদের দেখানো হয়নি।
ফিলিস্তিনি আইনজীবী তাওফিক জাবারিন এ ঘটনায় ইসরায়েলের উচ্চ আদালতে জরুরি নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেন। তার দাবি, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সেনাবাহিনী সরাসরি স্থাপনা না ভেঙে একজন বসতিস্থাপনকারীকে দিয়ে সেই কাজ করাচ্ছে।
আদালতে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের দেওয়া নথিতে অবশ্য বলা হয়েছে, হার্বস্টকে কৃষিকাজের জন্য ওই জমি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের মার্চে বিশ্ব জায়নবাদী সংস্থার সেটেলমেন্ট ডিভিশনের সঙ্গে তার একটি চুক্তিও হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
পরে ফেব্রুয়ারির হামলায় সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ সরানোর জন্য স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনুমতি চাওয়া হলে সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন তা অনুমোদন করে। এরপর জর্ডান ভ্যালি ব্রিগেডের কমান্ডার হার্বস্টকে সামরিক নিরাপত্তা দেওয়ার অনুমতি দেন।
চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি ওই এলাকায় বড় ধরনের হামলার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মুখোশধারী কয়েক ডজন বসতিস্থাপনকারী সেখানে গিয়ে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর বাড়িতে হামলা চালায়।
বেদুইন সম্প্রদায়ের বাসিন্দা আলি কাবনেহ জানান, হামলার সময় তাকে ও তার স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। তার দাবি, ওই ঘটনায় তাদের সম্প্রদায়ের ১৩টি পরিবারকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়।
কাবনেহর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার পর তার প্রায় ১৫০টি ভেড়া ছড়িয়ে পড়ে এবং একটি বৈধ ট্রাক্টরও নিয়ে যাওয়া হয়। তার দাবি, ওই দিন বেদুইন বসতিতে ১৩টি বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছিল। পাশের এলাকায় আরও তিনটি বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এরপরও তাদের অনেককে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির অবশিষ্ট অংশে বসবাস করতে হয়েছে। কেউ কেউ আশ্রয়হীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
বাসিন্দা ও অধিকারকর্মীদের দাবি, ধ্বংসের পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে শুধু আবর্জনা পরিষ্কারের বিষয়টি নেই। বরং বসতবাড়ি সরিয়ে জমিটি ভবিষ্যতে কৃষিকাজে ব্যবহারের প্রস্তুতি চলছে।
রাষ্ট্রের আদালতে দেওয়া নথি অনুযায়ী, হার্বস্টকে ওই জমিতে কৃষিকাজের জন্য ব্যবহারাধিকার দেওয়া হয়েছিল। তবে স্থানীয়রা বলছেন, জমির সুনির্দিষ্ট সীমানা বা মানচিত্র তাদের দেখানো হয়নি।
ফিলিস্তিনি বাসিন্দা হুসেইন তাহা অভিযোগ করেন, প্রথমে হামলার মাধ্যমে বাড়িঘর ধ্বংস করা হয়েছে, পরে সেই ধ্বংসাবশেষ সরানোর নামে জমি পরিষ্কার করা হচ্ছে। এরপর সেখানে কৃষিকাজ শুরু করে বসতিস্থাপনকারীরা জমির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে বলেও তার অভিযোগ।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা কোনো জবাব দেয়নি। হানান হার্বস্টের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন কেটে দেন এবং পরবর্তী যোগাযোগেরও জবাব দেননি।
ধ্বংস ও চলাচলে বাধার কারণে মোহাম্মদ সালাহ তার স্ত্রী ও চার সন্তানকে বেথলেহেমে ভাড়া বাসায় সরিয়ে নিয়েছেন। প্রতি মাসে ভাড়ার জন্য তাকে প্রায় ২ হাজার ইসরায়েলি শেকেল দিতে হচ্ছে। সেখানে কাজের সুযোগও পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।
নিজের পুরোনো বাড়ির কাছে মাঝে মাঝে একাই ফিরে আসেন সালাহ। কিন্তু বাড়ির সামনে জমে থাকা ধ্বংসাবশেষের কারণে স্বাভাবিকভাবে সেখানে প্রবেশ করতে পারেন না।
সালাহ বলেন, সন্তানরা বারবার জানতে চায়—তারা কেন নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারছে না। সন্তানদের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারাটাই তার কাছে সবচেয়ে কষ্টের।
তার ভাষায়, তিনি সন্তানদের সবসময় শিখিয়েছেন, ঝামেলা না করলে কেউ তাদের ক্ষতি করবে না। কিন্তু নিজেদের বাড়ি ধ্বংস হওয়ার পর সেই কথার সত্যতা নিয়েই সন্তান প্রশ্ন তুলছে।
জেরিকোর প্রান্তে ধ্বংস হওয়া বাড়িগুলো ঘিরে এই পরিস্থিতি পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনি ভূমি দখল এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, বাড়িঘর ও বসতি সরিয়ে জমি নিয়ন্ত্রণের এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে আরও ফিলিস্তিনি পরিবারকে নিজেদের এলাকা ছাড়তে হতে পারে।