Wednesday, July 15, 2026

গাজার চিকিৎসক হাসান আলমুকায়েদ ২১ মাস ধরে ইসরায়েলি হেফাজতে, অপেক্ষায় পরিবার


ছবিঃ ২০২৪ সালের অক্টোবরে গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতাল থেকে ইসরায়েলি বাহিনী ড. হাসান খলিল আল-মুকায়েদকে তুলে নিয়ে যায়। (সংগৃহীত । আল জাজিরা /নেমেৰ শাহিন)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN 

গাজার উত্তরাঞ্চলের কামাল আদওয়ান হাসপাতালের ভাসকুলার সার্জন ডা. হাসান খলিল আলমুকায়েদকে আটকের পর প্রায় ২১ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো অভিযোগ ছাড়াই ইসরায়েলি হেফাজতে রয়েছেন তিনি। স্বামীকে হারানোর শূন্যতা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁর স্ত্রী নাদিয়া আলমুকায়েদ।

২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে উত্তর গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান তীব্র হলে হাসান আলমুকায়েদ তাঁর পরিবারসহ কামাল আদওয়ান হাসপাতালে আটকা পড়েন। ওই হাসপাতালেই চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। হামলা ও অবরোধের মধ্যেও হাসপাতাল ছেড়ে যেতে অস্বীকৃতি জানান হাসান। কারণ, সেখানে তখনো অসংখ্য রোগী ও আহত মানুষ চিকিৎসাধীন ছিলেন।

নাদিয়া আলমুকায়েদ জানান, যুদ্ধের শুরু থেকে আটকের আগ পর্যন্ত তাঁর স্বামী নিয়মিত রোগীদের সেবা দিয়ে গেছেন। নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেও তিনি হাসপাতাল ছাড়েননি।

তিনি বলেন, “যুদ্ধের শুরু থেকে হাসানকে নিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি কখনো রোগী ও আহতদের সেবা বন্ধ করেননি।”

ইসরায়েলি বাহিনী যখন কামাল আদওয়ান হাসপাতালে অভিযান চালায়, তখন চিকিৎসক ও পরিবারগুলোকে আলাদা করে দেওয়া হয়। নাদিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, সেনারা চিকিৎসকদের আশ্বস্ত করেছিল যে তাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না এবং তাদের গ্রেপ্তার করা হবে না।

কিন্তু পরে সেই আশ্বাস বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

স্বামীকে বিদায় জানানোর মুহূর্তের কথা স্মরণ করে নাদিয়া বলেন, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। তিন সন্তান—১৩ বছরের মুহাম্মদ, ১১ বছরের মালাক ও ৮ বছরের হালাকে নিয়ে তিনি দক্ষিণ গাজার দিকে চলে যান।

এরপরও কিছু সময় ফোনে যোগাযোগ ছিল হাসানের সঙ্গে। কিন্তু এক রাতে হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে নাদিয়া ধারণা করেন, তাঁকে আটক করা হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গাজা থেকে আটক হওয়া অন্তত ১৫ জন চিকিৎসক বর্তমানে ইসরায়েলি হেফাজতে রয়েছেন। তাদের মধ্যে কামাল আদওয়ান হাসপাতালের পরিচালক ডা. হুসাম আবু সাফিয়াও রয়েছেন।

অধিকারকর্মীদের দাবি, এসব চিকিৎসককে ইসরায়েলের ‘আনলফুল কমব্যাট্যান্টস ল’–এর আওতায় আটক রাখা হয়েছে, যেখানে অভিযোগ ও বিচার ছাড়াই দীর্ঘদিন আটক রাখার সুযোগ রয়েছে।

ডা. হাসানকে প্রথমে ইসরায়েলের সেদ তেইমান আটককেন্দ্রে রাখা হয়। পরে তাঁকে নেগেভ কারাগারে স্থানান্তর করা হয় বলে জানা গেছে।

পরিবারের সবচেয়ে বড় কষ্ট—হাসান এখনো জানেন না তাঁর বাবা খলিল আলমুকায়েদ মারা গেছেন। হাসপাতাল অভিযানের সময় তিনিও সেখানে আটকা পড়েছিলেন। পরে মুক্তি পেলেও মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। কয়েক মাস পর ছেলেদের জন্য দুশ্চিন্তা ও কষ্টে তাঁর মৃত্যু হয় বলে পরিবারের দাবি।

নাদিয়া জানান, স্বামীর মানসিক অবস্থার কথা ভেবে এখনো তাঁকে বাবার মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি।

গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া হাসান আলমুকায়েদ স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘ডাক্তার’ নামে। রোমানিয়ায় চিকিৎসাশাস্ত্র পড়াশোনা শেষে তিনি কিছু সময় সুইডেনে কাজ করেন। পরে ২০১০ সালে বাবা-মায়ের দেখাশোনা ও মানুষের সেবার জন্য গাজায় ফিরে আসেন।

হাসপাতালের দায়িত্বের পাশাপাশি নিজ বাড়িতে একটি ছোট ক্লিনিকও পরিচালনা করতেন তিনি। দরিদ্র রোগীদের কাছ থেকে কোনো অর্থ নিতেন না বলে জানান স্বজনরা।

যুদ্ধের সময় তাঁর গাড়ি ধ্বংস হয়ে গেলে হাসপাতালের দায়িত্ব পালনের জন্য গাধার গাড়িতে চড়ে যাতায়াত করতেন হাসান।

মানবাধিকার সংগঠন ‘ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস-ইসরায়েল’ (পিএইচআরআই)-এর সদস্য নাজি আব্বাস অভিযোগ করেছেন, আটক চিকিৎসকদের অনেকেই কারাগারে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন।

তাঁর দাবি, চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হচ্ছে না, নিয়মিত শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে এবং অনেক সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে।

পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হাসান ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। আটকের পর তাঁর ওজন প্রায় ৪০ কেজি কমে গেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও কারা কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

হাসানের ভাই মাহমুদ আলমুকায়েদ, যিনি নিজেও আটক ছিলেন, পরে মুক্তি পেয়েছেন। তিনি ফিরে দেখেন তাঁদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং পরিবার তাঁবুতে বসবাস করছে।

স্বজনদের ভাষ্য, মাহমুদ কারাগারের জীবনকে “নরকের মতো” বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, ধ্বংস হয়ে যাওয়া গাজাও কারাগারের তুলনায় অনেক ভালো।

এদিকে হাসানের স্ত্রী নাদিয়া বর্তমানে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর সঙ্গে শিক্ষকতা করে সংসার চালাচ্ছেন। তাঁবুতে বসবাস, সন্তানদের একা বড় করা এবং স্বামীর অনুপস্থিতি—সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছেন তিনি।

সন্তানদের জন্মদিনে এখনো বাবাকে মনে পড়ে। নাদিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, তারা প্রায়ই বলে—“বাবা থাকলে আমাদের জন্য অনুষ্ঠান করতেন, সমুদ্রে নিয়ে যেতেন।”

আর সেই অপেক্ষাতেই দিন গুনছে হাসান আলমুকায়েদের পরিবার—কবে ফিরবেন তাঁদের প্রিয় মানুষ, সেই আশায়।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন