- ২১ জুলাই, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
রাজধানীর অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা সিটি কলেজে শিক্ষক নিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) এক অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলেজটিতে বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পাওয়া ১৯৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগ প্রচলিত বিধি অনুসরণ করে হয়নি। একই সঙ্গে গভর্নিং বডির সদস্যদের প্রায় দুই কোটি টাকা সিটি অ্যালাউন্স গ্রহণ এবং আর্থিক লেনদেনে নানা অনিয়মের বিষয়ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সম্প্রতি ডিআইএ পরিচালিত ওই নিরীক্ষায় কলেজটির নিয়োগ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়। অডিট কর্মকর্তা চন্দন কুমার দেব ও সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মনিরুজ্জামানের স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসারে তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন বিধি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রণালয়।
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলেজটিতে ১৯৮২ সালের নিয়োগ বিধিমালা অনুসরণ না করেই ১০৫ জন শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছেন ১৮ জন অধ্যাপক, ৩৭ জন সহযোগী অধ্যাপক, ৪৬ জন প্রভাষক এবং কয়েকজন সহকারী অধ্যাপক ও ডেমোনস্ট্রেটর।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে শুধু পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে। অথচ নিয়োগ বোর্ডে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধির উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে নিয়োগ কমিটি গঠন ও গভর্নিং বডির আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রয়োজনীয় নথিও কলেজ কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি।
এ ছাড়া জনবল কাঠামো পর্যালোচনায় ডিআইএ জানিয়েছে, অনুমোদিত কাঠামোর বাইরে অতিরিক্ত ৩৪ জন অধ্যাপক ও ৪৭ জন সহযোগী অধ্যাপক কর্মরত রয়েছেন। তারা উচ্চ বেতন গ্রেডে বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন, যা নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে কলেজটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও একাধিক অসঙ্গতির কথা বলা হয়েছে। ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত প্রায় ৭২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে সরাসরি নগদে ব্যয় করা হয়েছে। সরকারি আর্থিক বিধি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের আয় ব্যাংকে জমা দিয়ে চেকের মাধ্যমে ব্যয় করার কথা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি।
ডিআইএর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা সাময়িক আত্মসাতের শামিল হতে পারে।
এ ছাড়া ঠিকাদারি কাজ ও বিভিন্ন ক্রয়ে উৎসে ভ্যাট কর্তন না করায় সরকারের প্রায় ২৮ লাখ ৩২ হাজার টাকার রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে। পাবলিক পরীক্ষার সম্মানীর বিপরীতে উৎসে আয়কর না কাটায় আরও প্রায় ২ লাখ ৯২ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে গভর্নিং বডির সদস্যরা বিধিবহির্ভূতভাবে মোট ১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩০ টাকা সিটি অ্যালাউন্স গ্রহণ করেছেন। ওই অর্থ ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে তার প্রমাণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দাখিলের সুপারিশ করেছে ডিআইএ।
অডিট প্রতিবেদনে ভবিষ্যতে সব ধরনের আর্থিক লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করা, ক্রয় কমিটির মাধ্যমে কেনাকাটা পরিচালনা, হিসাবপত্র সংরক্ষণ, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা জোরদার এবং ভ্যাট-কর সংক্রান্ত সরকারি বিধি কঠোরভাবে অনুসরণের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মহিলা শিক্ষক কোটা বর্তমান অবস্থায় বজায় রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়োগেও কমপক্ষে ৪০ শতাংশ নারী শিক্ষক নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে কলেজটির বিরুদ্ধে চলমান কয়েকটি মামলার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে আবাসিক এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণসংক্রান্ত একটি রিট মামলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অসদুপায়ের অভিযোগে দুটি মামলা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত দুটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে কলেজ কর্তৃপক্ষ নিরীক্ষা দলকে জানিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা সিটি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কাজী নিয়ামুল হক বলেন, তিনি অডিট প্রতিবেদনটি পেয়েছেন। তবে তার দাবি, ২০২৬ সালে এসে ২০২২ সালের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ পাওয়াকে তিনি রহস্যজনক, বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, প্রতিবেদনে যাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের অনেকেই বর্তমানে দায়িত্বে নেই; কেউ বরখাস্ত হয়েছেন, আবার কেউ পলাতক রয়েছেন।
অডিট প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই নজর রয়েছে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের। তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে দেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে।