- ২১ জুলাই, ২০২৬
ডেস্ক রিপোর্ট: PNN
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতি ও প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে শুরু হওয়া ‘ককরোচ’ আন্দোলন এবার নতুন মাত্রা পেয়েছে। সোমবার সংসদ ভবনের দিকে পদযাত্রা করতে গেলে ১০ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীর ওপর টিয়ার গ্যাস ছোড়ে এবং লাঠিচার্জ করে দিল্লি পুলিশ। আন্দোলনকারীরা শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এটি এখন পর্যন্ত এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সমাবেশ বলে জানিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যম। বিক্ষোভকারীদের বড় একটি অংশ ছিলেন শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী, তরুণ পেশাজীবী এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা। অনেকেই খাবার ও পানি নিয়ে সকাল থেকেই জড়ো হন দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে, যেখান থেকে সংসদের উদ্দেশে পদযাত্রা শুরু হয়।
পথে নামার পরপরই পুলিশ তাদের আটকে দেওয়ার চেষ্টা করে। বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড বসানো হয়, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করা হয় এবং লাঠিচার্জের ঘটনাও ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে দাঙ্গা পুলিশকে বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠি চালাতে দেখা গেছে। যদিও দিল্লি পুলিশ শুরুতে সংঘর্ষের খবর অস্বীকার করে।
দিল্লির উপ-পুলিশ কমিশনার সচিন শর্মা বলেন, যন্তর মন্তরের নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলে আর জায়গা নেই। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই তিনি আন্দোলনকারীদের ঘরে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
তবে বিক্ষোভকারীরা দাবি করেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দিয়ে সরকার পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করেছে। আন্দোলন চলাকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে নানা স্লোগান দেন তারা।
যোগব্যায়াম প্রশিক্ষক জ্যোতি রাজপুত বলেন, "এই পচে যাওয়া ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের কষ্ট দেখতে পায় না। তাই আজ এত মানুষ রাস্তায় নেমেছে।"
২৬ বছর বয়সী আন্দোলনকারী স্নেহা এপ্পিলি বলেন, "আমি এই সরকারকেই ভোট দিয়েছি। তাই তাদের কাছে জবাব চাওয়ার অধিকার আমার আছে। একজন নাগরিক হিসেবে এটাই আমার মৌলিক অধিকার।"
শনিবার আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে তিন সপ্তাহ ধরে অনশনরত ৫৯ বছর বয়সী পরিবেশবাদী ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে জোর করে হাসপাতালে নেওয়ার ঘটনায় আন্দোলনে নতুন করে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। অনেকের মতে, এ ঘটনাই সোমবারের বিক্ষোভে মানুষের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে আন্দোলনের মুখে সরকার কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে.পি. নাড্ডার সঙ্গে আলোচনার জন্য আন্দোলনের দুই প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে আন্দোলনের মুখপাত্র সৌরভ দাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, "সরকার আলোচনা করতে চাইছে, কিন্তু আমাদের দাবিগুলো পরিষ্কার। দেশের তরুণরা এখন রাস্তায় নেমেছে।"
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রশ্নফাঁস, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। গত মে মাসে অনুষ্ঠিত মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রায় ২২ লাখ পরীক্ষার্থীকে আবারও পরীক্ষা দিতে হয়। নতুন পরীক্ষা কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে সাময়িকভাবে টেলিগ্রাম অ্যাপও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
দীর্ঘ প্রস্তুতি, মানসিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা লাখো শিক্ষার্থী পুনরায় পরীক্ষা দিতে বাধ্য হওয়ায় দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে অন্তত এক ডজন পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবরও উঠে এসেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে।
আন্দোলনের নামটিও এসেছে বিতর্কিত এক মন্তব্য থেকে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এক পর্যায়ে বেকার তরুণদের প্রসঙ্গে ‘ককরোচ’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে সেই শব্দটিকেই বিদ্রূপের ভাষা থেকে প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করেন আন্দোলনকারীরা। নিজেদের সংগঠনের নাম দেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’, যা ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামেরও ব্যঙ্গাত্মক প্রতিফলন।
প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট ও মিমের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়া এই আন্দোলন এখন রাজপথে বড় জনসমাবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৃতীয় মেয়াদে তরুণদের নেতৃত্বে এটি সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় জনআন্দোলনগুলোর একটি। ইতোমধ্যে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি বলিউডের কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তিও এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
তথ্যসূত্রঃ আল জাজিরা