- ২১ জুলাই, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
হামাসের নতুন নেতা হিসেবে খলিল আল-হাইয়ার নির্বাচনের খবর গাজায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ এটিকে সংগঠনের ধারাবাহিকতা রক্ষার রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন, আবার অনেক সাধারণ ফিলিস্তিনির কাছে এই পরিবর্তনের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত জীবনে বেঁচে থাকার লড়াই।
হামাসের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে সাবেক রাজনৈতিক প্রধান খালেদ মেশালের বিপরীতে জয় পান খলিল আল-হাইয়া। তবে গাজার বহু বাসিন্দার মতে, নেতৃত্বের পরিবর্তনের চেয়ে তাদের কাছে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপদ আশ্রয়, খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ।
গাজার বাসিন্দা ৬৩ বছর বয়সী নোমান সালেহ যুদ্ধের কারণে নিজের কারখানা হারিয়েছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ সংঘাত মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
সালেহ বলেন, “মানুষ ক্ষুধার্ত, মানুষ অপমানিত। আজ মানুষের পাশে কে দাঁড়িয়েছে? কেউ না। শুধু কোনো একটি দলের নয়, সব রাজনৈতিক পক্ষেরই মানুষের দুর্ভোগের দায় রয়েছে।”
তিনি বলেন, নতুন নেতা নির্বাচিত হলেও সাধারণ মানুষের কঠিন বাস্তবতায় বড় কোনো পরিবর্তন আসবে বলে তিনি মনে করেন না। তার ভাষায়, “আমরা এমন নেতৃত্ব চাই, যারা দেশের প্রতি অনুগত থাকবে, সৎ হবে এবং সাধারণ মানুষের কষ্ট বুঝবে।”
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া যুদ্ধের পর থেকে গাজার বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলি অবরোধ ও সামরিক অভিযানের কারণে সেখানকার বাসিন্দারা খাদ্য, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটে রয়েছেন।
গাজা সিটির ৪০ বছর বয়সী এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকর্মী আহমেদ (নিরাপত্তার কারণে পূর্ণ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, কঠিন সময়ে হামাসের নতুন নেতার দায়িত্ব গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা।
তিনি বলেন, “হামাসের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন সময়ে খলিল আল-হাইয়া নেতৃত্বে এসেছেন। এই পরিস্থিতিতে সংগঠনের ঐক্য ধরে রাখা তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।”
তার মতে, গাজার মানুষ এখন এমন নেতৃত্ব চান, যারা তাদের কাছাকাছি থাকবে এবং তাদের দুর্ভোগ বুঝবে।
তবে ২৮ বছর বয়সী আলী আবু আমশির কাছে নেতৃত্বের পরিবর্তনের চেয়ে নিজের হারানো স্বজনদের স্মৃতি এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামই বড় বিষয়। যুদ্ধে তিনি পরিবারের ২২ সদস্যকে হারিয়েছেন, যার মধ্যে বাবা-মা ও এক ভাইও রয়েছেন।
আলী বলেন, “আমরা শুধু বাঁচতে চাই। সীমান্ত খুলে দেওয়া হোক, খাবার ও পানি পাওয়া যাক, একটি স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসুক। কে নেতৃত্ব দেবে—এটি এখন আমাদের প্রধান চিন্তা নয়।”
তিনি বলেন, “আমি ভেতর থেকে মৃত, কিন্তু এখনো বেঁচে আছি। আমরা আর যুদ্ধ চাই না। আমরা শুধু শান্তিতে থাকতে চাই।”
গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক মাহমুদ হানিয়েহ মনে করেন, খলিল আল-হাইয়ার নির্বাচন হামাসের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা।
তার মতে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে হামাস বোঝাতে চেয়েছে যে তারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও কৌশলগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চায়।
তিনি বলেন, “ইসরায়েল খলিল আল-হাইয়াকে হামাসের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিদের একজন হিসেবে দেখে। তাকে নির্বাচিত করার মাধ্যমে সংগঠন নিজেদের অবস্থান থেকে সরে না যাওয়ার বার্তা দিয়েছে।”
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, গাজার সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থার সংকট বাড়ছে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুস্তাফা ইব্রাহিম বলেন, অনেক মানুষ এখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে বাস্তব জীবনের পরিবর্তন দেখতে চান।
তিনি বলেন, “মানুষের প্রধান প্রশ্ন এখন কে নেতা হলেন তা নয়; তারা জানতে চায়—এই নেতৃত্ব যুদ্ধ বন্ধ করতে পারবে কি না, একটি সমঝোতা আনতে পারবে কি না এবং তাদের জীবন বদলাতে পারবে কি না।”
হামাস এর আগে জানিয়েছে, তারা গাজার প্রশাসনিক ক্ষমতা একটি নতুন ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদভিত্তিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গঠিত ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি) ভবিষ্যৎ প্রশাসনের দায়িত্ব নিতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
তবে বাস্তবে গাজার পরিস্থিতির বড় কোনো পরিবর্তন এখনো দেখা যায়নি। যুদ্ধ, ধ্বংস ও মানবিক সংকটের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই—দীর্ঘ সংঘাতের অবসান এবং নিরাপদ জীবন।
খলিল আল-হাইয়ার নেতৃত্বে হামাসের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গাজার মানুষের কাছে সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ।