- ২১ জুলাই, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
২০১৩ সালে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার ওপর তথ্য সংগ্রহ করেছিল ইসরায়েল—এমন একটি সরকারি নথি পাওয়ার দাবি করেছে আল জাজিরা। নথিতে বিশ্বের পরিচিত কয়েকটি মানবিক সংস্থার তথ্যের পাশাপাশি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাদের অবস্থান সম্পর্কিত মন্তব্যও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের একটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া একটি স্প্রেডশিটে ১৫০টির বেশি দাতব্য সংস্থার নাম, তৎকালীন পরিচালকের তথ্য, ঠিকানা, ফোন নম্বর, ই-মেইল এবং কার্যক্রমের ক্ষেত্র উল্লেখ ছিল।
নথির ‘মন্তব্য’ অংশে কয়েকটি সংস্থাকে নিয়ে রাজনৈতিক মূল্যায়নও যুক্ত করা হয়। সেখানে ফ্রান্সভিত্তিক প্রিমিয়ার আরজেন্স ইন্টারন্যাশনালকে ‘ইসরায়েলের সমালোচক’, জেনেভাভিত্তিক ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনালকে ‘ইসরায়েলবিরোধী প্রচারে জড়িত’ এবং স্পেনের মুন্ডুবাটকে ‘বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা (বিডিএস) আন্দোলনে সক্রিয়’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
নথিতে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফাম সম্পর্কেও মন্তব্য রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। সেখানে সংস্থাটিকে বৈশ্বিক বিডিএস কার্যক্রমে সক্রিয় বলে উল্লেখ করা হয় এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়ে অভিযোগ তোলা হয়।
অক্সফাম আল জাজিরাকে জানিয়েছে, এসব মন্তব্য তাদের কার্যক্রমের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নয়, বরং অভিযোগ ও ব্যাখ্যার ভিত্তিতে করা হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, তারা কঠোর জবাবদিহি ও মানবিক নীতিমালা অনুসরণ করে কাজ করে এবং বিডিএস আন্দোলনকে সমর্থন বা প্রচার করে না।
ফিলিস্তিনিদের চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন গিশা’র নির্বাহী পরিচালক তানিয়া হারি বলেন, এই নথি নিরাপত্তাজনিত কোনো কার্যক্রমের অংশ নয়।
তার দাবি, “এটি প্রমাণ করে যে ফিলিস্তিনিদের জন্য জীবন রক্ষাকারী কাজ করা সংগঠনগুলোর কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করছে ইসরায়েলি সরকার।”
তবে গিশার নাম ওই তালিকায় ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, নথিটি ইসরায়েলের তৎকালীন শ্রম, সমাজকল্যাণ ও সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
নথিটি ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে তৈরি করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সময় ইসরায়েলবিরোধী বিডিএস আন্দোলন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই সময় ইসরায়েল বিভিন্ন সংগঠন ও আন্দোলনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছিল।
লন্ডনের কিংস কলেজের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগের শিক্ষক মায়সুন সুকারিয়াহ বলেন, “২০১৩ সালে ইসরায়েল বিডিএস আন্দোলনের প্রভাব অনুভব করতে শুরু করেছিল। সম্ভবত বিভিন্ন সংগঠনের তথ্য একত্র করার উদ্দেশ্যেই এ ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল।”
ইউরোপিয়ান লিগ্যাল সাপোর্ট সেন্টারের পরিচালক জিওভান্নি ফাসিনা বলেন, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছে। তার মতে, এই নথি সেই প্রক্রিয়ার একটি অংশ হতে পারে।
নথিতে আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার নাম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডেনমার্কের ড্যানচার্চএইড, সুইডেনের ডিয়াকোনিয়া, যুক্তরাজ্যের মেডিকেল এইড ফর প্যালেস্টিনিয়ানস, জার্মানির মেডিকো ইন্টারন্যাশনাল, নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল এবং ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্টারন্যাশনাল।
মেডিকো ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তা রিয়াদ ওথম্যান বলেন, ইসরায়েলি নথিতে তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যে মন্তব্য করা হয়েছে, তা অতিরঞ্জিত।
তিনি বলেন, “আমরা কখনো বিডিএস আন্দোলনের ডাক দিইনি। তবে ব্যক্তি ও সংগঠনের শান্তিপূর্ণ বয়কটের আহ্বানের অধিকারকে সমর্থন করেছি।”
সুইডেনের প্যালেস্টাইন সলিডারিটি অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠনগুলোর ওপর ইসরায়েলি নজরদারি নতুন কোনো বিষয় নয়। সংগঠনটি বিডিএস আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও স্বীকার করেছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় শুরু হওয়া যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন মানবিক সংস্থার ত্রাণ কার্যক্রমে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, বিদেশি ত্রাণকর্মী ও চিকিৎসকদের প্রবেশে বাধা দিয়েছে এবং কিছু সংস্থার কাছে কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য চেয়েছে।
বিশেষজ্ঞ মায়সুন সুকারিয়াহ বলেন, ফিলিস্তিনে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সময়ের সঙ্গে তাদের কাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বেড়েছে।
তিনি বলেন, “ফিলিস্তিনে মানবিক কার্যক্রম সবসময়ই প্রয়োজনীয় ছিল, কিন্তু একই সঙ্গে এসব সংস্থাকে নানা ধরনের বিধিনিষেধের মুখোমুখি হতে হয়েছে।”