- ০৮ জানুয়ারি, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
ইরানের রাজধানী তেহরানে শীতল এক ডিসেম্বরের দিনে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজার ও জোমহুরি (রিপাবলিক) অ্যাভিনিউ এলাকায় একাধিক ব্যবসায়ী দোকান বন্ধ রেখে প্রতিবাদ জানান। মূল কারণ—ইরানের জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের লাগাতার দরপতন। গত এক বছরে রিয়ালের মূল্য প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় প্রতিদিনই বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা।
রাজধানীতে শুরু হওয়া এই ক্ষোভ পরে পশ্চিম ইরানের আজনা, মালেকশাহী ও কেরমানশাহসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণের মারভদাশত এবং মধ্যাঞ্চলের ফুলাদশাহরেও বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়। কোথাও কোথাও প্রতিবাদ সহিংসতায় রূপ নেয়, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে হতাহত ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটে।
ইরানে এর আগেও একাধিকবার বড় ধরনের আন্দোলন হয়েছে—১৯৯৯–২০০৩ সালের ছাত্র আন্দোলন, ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর ‘গ্রিন মুভমেন্ট’, কিংবা ২০২২–২৩ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন। তবে সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভে রাজনৈতিক দাবি তুলনামূলকভাবে কম। মানুষের রাস্তায় নামার পেছনে প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে মূল্যস্ফীতি, স্থবির আয়, বেকারত্ব ও নিত্যপণ্যের লাগামছাড়া দাম।
দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় ইরানের অর্থনীতি চাপে পড়েছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ দৈনন্দিন খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
এবারের বিক্ষোভে সরকারের প্রতিক্রিয়াও আগের চেয়ে কিছুটা আলাদা। সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার স্বীকার করেছেন। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার নির্দেশ দেন এবং নাগরিকদের অভিযোগ শোনার ওপর জোর দেন।
সরকার ইতিমধ্যে নতুন ভর্তুকি কাঠামো, জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পরিকল্পনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নতুন গভর্নর নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে মুদ্রা স্থিতিশীল করা ও জনআস্থা ফেরানোর চেষ্টা চলছে।
তবে একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব কঠোর অবস্থানের কথাও জানিয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, প্রতিবাদ ন্যায্য হতে পারে, কিন্তু বিশৃঙ্খলা মেনে নেওয়া হবে না। সরকারের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও সহিংসতার মধ্যে পার্থক্য টানার কথা বলেছেন।
বিক্ষোভ ঘিরে বিদেশি হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বক্তব্য ইরান সরকারের সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে। তাদের মতে, এমন মন্তব্য আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
বর্তমানে কিছু শহরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও অর্থনৈতিক সংকট রয়ে গেছে। মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অস্থিরতা সাধারণ মানুষের জীবনকে এখনও চাপে রাখছে। সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে—এই ক্ষোভ প্রশমিত হবে, নাকি আবারও বড় আকারের আন্দোলনে রূপ নেবে। তথ্যসুত্রঃ আল জাজিরা