- ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তৃতীয় দফার আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে সুইজারল্যান্ডে। দুই দেশই কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কথা বললেও, একই সঙ্গে ওয়াশিংটন নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করায় পরিস্থিতিতে টানাপোড়েন বজায় রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বুধবার জেনেভায় পৌঁছে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাদর আলবুসাইদি–এর সঙ্গে বৈঠক করেন। ওমানই পরোক্ষভাবে এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। বৃহস্পতিবার নির্ধারিত বৈঠকে দুই পক্ষ নিজ নিজ প্রতিনিধিদলের মাধ্যমে আলোচনা চালাবে।
জেনেভায় রওনা হওয়ার আগে আরাঘচি বলেন, একটি “ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ” চুক্তি সম্ভব। তবে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র চায় না, কিন্তু শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার থেকেও সরে আসবে না।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স অভিযোগ করেন, গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনে মার্কিন হামলার পর তেহরান পুনরায় কর্মসূচি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোয়, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক পথকে অগ্রাধিকার দিলেও প্রয়োজনে অন্যান্য বিকল্পও বিবেচনায় রয়েছে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, ইরানের ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান কেন্দ্রগুলোতে হামলায় তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা “সম্পূর্ণ ধ্বংস” হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকরা এখনো সরেজমিন যাচাইয়ের সুযোগ পাননি।
এদিকে ট্রাম্প তার সাম্প্রতিক ভাষণে ইরানের বিরুদ্ধে “অশুভ পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা” ও যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির অভিযোগ তোলেন। তেহরান এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই বলেন, এসব বক্তব্য “বড় মিথ্যার পুনরাবৃত্তি” ছাড়া কিছু নয়।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, আলোচনায় মূলত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ফোকাস থাকবে। তবে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়েও ওয়াশিংটনের উদ্বেগ রয়েছে। ইরান এ বিষয়ে আলোচনায় বসতে অনাগ্রহী, দাবি করছে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কেবল প্রতিরক্ষামূলক।
তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক জানান, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, আঞ্চলিক কার্যক্রম এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতাসহ একাধিক বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে সমঝোতার পথ এখনো অনিশ্চিত।
আলোচনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ৩০টির বেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দাবি করেন, এসব নেটওয়ার্ক ইরানের তেল বিক্রি, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও অস্ত্র উৎপাদনে অর্থায়ন করেছে।
সামরিক ক্ষেত্রেও উত্তেজনা বাড়ছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র টিম হকিন্স বলেন, সম্ভাব্য উত্তেজনা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত রয়েছে। আরব সাগরে মার্কিন রণতরী মোতায়েন করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বিমানবাহী জাহাজ USS আব্রাহাম লিঙ্কন এবং বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী জাহাজ USS জেরাল্ড আর ফোর্ড। পাশাপাশি অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান ও হাজারো সেনা মোতায়েন করা হয়েছে অঞ্চলে।
ইরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু হবে এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে—যে পথ দিয়ে বিশ্বে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক আলোচনা চললেও দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার ঘাটতি প্রকট। সামরিক শক্তি প্রদর্শন ও নিষেধাজ্ঞা একদিকে, অন্যদিকে আলোচনার টেবিলে বসা—এই দ্বৈত কৌশলের মধ্যে চূড়ান্ত সমাধান কতটা সম্ভব হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।