Friday, July 17, 2026

অতিরিক্ত পাঠ্যবই মুদ্রণে সরকারের ৫১৬ কোটি টাকার ক্ষতি, অডিটে এনসিটিবির অনিয়মের অভিযোগ


প্রতীকী ছবিঃ এনসিটিবি (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা 

বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ কর্মসূচিতে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বিরুদ্ধে। প্রকৃত চাহিদার তুলনায় কোটি কোটি অতিরিক্ত বই মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়ায় সরকারের প্রায় ৫১৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষা কার্যক্রম শেষে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর এনসিটিবির ক্রয়সংক্রান্ত নথি, কার্যাদেশ, মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র পর্যালোচনা করে এ অনিয়মের তথ্য শনাক্ত করে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক, এসএসসি, ভোকেশনাল, দাখিল, ইবতেদায়ি, দাখিল ভোকেশনাল ও রেইল স্তরের পাঠ্যবই মুদ্রণ, বাঁধাই এবং সরবরাহের জন্য মোট ৭৪১টি লটের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব লটের বিপরীতে ৩০ কোটি ৮৯ লাখ ৪৩ হাজারের বেশি বই সরবরাহের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ১ হাজার ৮৬২ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কাজ শেষে প্রায় ৩০ কোটি ৪০ লাখ বই সরবরাহের তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে নিরীক্ষায় দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোর প্রকৃত চাহিদা ছিল মাত্র ২১ কোটি ৯৭ লাখ ৪০ হাজার ৬১১টি বই। অথচ বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনায় (এপিপি) বইয়ের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় ২৪ কোটি ৪৮ লাখের বেশি। অর্থাৎ প্রকৃত চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অতিরিক্ত বই মুদ্রণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৭ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভার সিদ্ধান্তে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতেই বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ-২০০৬) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০০৮) অনুসরণ করে সব কার্যক্রম সম্পন্ন করার নির্দেশনাও ছিল।

কিন্তু নিরীক্ষকদের দাবি, এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করে প্রকৃত চাহিদার চেয়ে বেশি বই মুদ্রণ ও সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সরকারের ৫১৬ কোটি ৩৪ লাখ ৪১ হাজার ২১১ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও জানা গেছে, নিরীক্ষা চলাকালে এনসিটিবির কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও সংস্থাটি কোনো লিখিত জবাব দেয়নি। নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষের মতে, এটি অডিট কোড এবং ট্রেজারি রুলসের সংশ্লিষ্ট বিধানের পরিপন্থী।

প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, অতিরিক্ত বই ক্রয়ের ফলে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিটিবির সদস্য (অর্থ) আজীজ হায়দার ভূইয়া বলেন, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং এ ধরনের কোনো অডিট প্রতিবেদন এখনো তার হাতে পৌঁছায়নি। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য তিনি প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

অন্যদিকে এনসিটিবির সচিব অধ্যাপক শাহ মুহাম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌস জানান, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কাছে পৌঁছেনি। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তা সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠিয়ে পর্যালোচনা করা হবে এবং এরপরই আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া সম্ভব হবে।

এদিকে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

শিক্ষা খাতের অন্যতম বৃহৎ সরকারি কর্মসূচি হিসেবে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ দীর্ঘদিন ধরেই প্রশংসিত। তবে সাম্প্রতিক এই নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশের পর পুরো ক্রয় ও পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন