- ১৭ জুলাই, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে আকস্মিকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির এই পদক্ষেপের পর রাজধানী কিয়েভসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকের মতে, যুদ্ধের মাঝেও সামরিক ও প্রযুক্তিগত সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা একজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ায় সরকার অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে।
মাত্র সাত মাস আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া ৩৫ বছর বয়সী ফেদোরভের সামরিক অভিজ্ঞতা না থাকলেও প্রশাসনিক দক্ষতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কারের জন্য তিনি দ্রুতই আলোচনায় আসেন। এর আগে ডিজিটাল রূপান্তরবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে ইউক্রেনের সরকারি সেবাকে আধুনিকায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর ফেদোরভ প্রতিরক্ষা খাতে নানা সমস্যার তালিকা তৈরি করেন। তার পর্যবেক্ষণে উঠে আসে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বণ্টনে অসামঞ্জস্য, অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ঘন ঘন কমান্ড পরিবর্তন এবং সংস্কারপন্থী কর্মকর্তাদের উপেক্ষার মতো বিষয়।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে থাকাকালে তিনি ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক যুদ্ধ সরঞ্জাম উন্নয়ন, স্থলভিত্তিক রোবট ব্যবহারের সম্প্রসারণ এবং সামরিক ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেন। ইউক্রেনের সাম্প্রতিক কয়েকটি সফল ড্রোন অভিযানের পেছনেও তার নীতিগত ভূমিকার কথা বিশ্লেষকদের অনেকেই উল্লেখ করছেন।
তবে এসব সংস্কার সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে প্রধান সেনাপতি ওলেক্সান্দর সিরস্কির সঙ্গে তার মতবিরোধ তৈরি করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, সেই দ্বন্দ্বই শেষ পর্যন্ত তার বিদায়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ফেদোরভকে সরানোর ঘোষণার পর রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল—‘ফেদোরভ রাশিয়ার জন্য দুঃস্বপ্ন’, ‘যা ঠিকভাবে চলছে, তা ভাঙবেন না’ এবং ‘জেলেনস্কি নিজেই নিজের ক্ষতি করলেন’—এমন নানা স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড।
অনেক সেনাসদস্য প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে না চাইলেও কয়েকজন জানিয়েছেন, ফেদোরভের নেতৃত্বে সামরিক ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছিল। যদিও সেনা নিয়োগ সংকট বা দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের সমস্যার মতো বড় কিছু চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি সমাধান হয়নি, তবুও তার নেওয়া বাস্তবধর্মী পদক্ষেপগুলো কার্যকর ছিল বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে ফেদোরভ নিজেও নীরব থাকেননি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, সামরিক নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও ষড়যন্ত্রের কারণেই চলমান সংস্কারের গতি থেমে যাচ্ছে। তবে একই সঙ্গে তিনি প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে ইঙ্গিত দেন, বিষয়টি নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফেদোরভকে ঘিরে জনসমর্থন দ্রুত বাড়ছে, যা যুদ্ধকালীন ইউক্রেনের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। তাদের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির জনপ্রিয়তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন দুর্নীতির অভিযোগ এবং যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিয়ে সরকার ইতোমধ্যেই নানা সমালোচনার মুখে রয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চতুর্থ বছরে এসে প্রতিরক্ষা নেতৃত্বের এই পরিবর্তন শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সামরিক কৌশল—উভয় ক্ষেত্রেই নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।