- ১৭ জুলাই, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। টানা ষষ্ঠ রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরান।
দুই দেশের মধ্যে সংঘাত শুরুর পর শুক্রবার ভোরে নতুন করে এই হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটায় পুরো অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
ইরানের দাবি, গত ২২ জুন সুইজারল্যান্ডে যুদ্ধবিরতি ও ৬০ দিনের আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। দেশটির সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত মার্কিন হামলায় অন্তত ৩৮ জন নিহত এবং চার শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এর মধ্যে সর্বশেষ রাতের হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত আটজন।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শুক্রবার ভোরে স্থানীয় সময় অনুযায়ী নতুন দফার অভিযান সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে কোন কোন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় অন্তত ছয়টি সেতু, একটি রেলস্টেশন এবং আরও কয়েকটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, হরমোজগান প্রদেশে অবস্থিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলার ফলে বন্দর আব্বাস ও আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থারও ক্ষতি হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলেও ধীরে ধীরে তা পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নতুন করে পাল্টা হামলার ঘোষণা দিয়েছে। সংগঠনটির দাবি, সংঘাত শুরুর পর এটি তাদের ১৩তম প্রতিশোধমূলক অভিযান।
বাহরাইনে শুক্রবার সকালে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজানো হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানায়।
কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে ভূপাতিত করেছে। তবে রাজধানী দোহার আকাশে প্রতিরোধ অভিযানের সময় ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক শিশু আহত হয়েছে। বর্তমানে সে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকে ওমানে একটি মার্কিন রাডার স্থাপনা ধ্বংসের দাবিও করা হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি তেলবাহী জাহাজ অজ্ঞাত উৎসের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
কুয়েতে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার, অস্ত্রাগার এবং হিমার্স ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি। যদিও এসব দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা তিনটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
অন্যদিকে সিরিয়ার আল-তানফে অবস্থিত মার্কিন বিশেষ বাহিনীর একটি সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি। তাদের ভাষ্য, ইরানি সেনা সদস্য নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
এদিকে ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি সতর্ক করে বলেছেন, চলমান সংঘাতের পর হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি আর আগের মতো থাকবে না। তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ড এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতার প্রচেষ্টা ব্যাহত করতে ইসরায়েল সরকারের কিছু সদস্য মার্কিন জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তার এই মন্তব্য নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
সামরিক হামলা, পাল্টা আক্রমণ এবং কূটনৈতিক উত্তেজনা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক মহল দ্রুত সংঘাত নিরসন ও আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানালেও এখন পর্যন্ত দুই পক্ষের অবস্থানে নমনীয়তার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে না।