- ১৬ জুলাই, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
একসময় চীনের রাজধানী বেইজিং ছিল সাফল্য, সম্ভাবনা এবং উন্নত জীবনের প্রতীক। ভালো চাকরি, উচ্চ আয়ের আশা কিংবা নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো তরুণ-তরুণী ভিড় জমাতেন এই শহরে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্বল হয়ে পড়া চাকরির বাজার এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে এখন অনেক তরুণই বেইজিং ছেড়ে অপেক্ষাকৃত ছোট শহরে নতুন জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
চীনের অর্থনীতির দীর্ঘদিনের প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল ব্যাপক অভ্যন্তরীণ অভিবাসন। গত তিন দশকে বেইজিংয়ের জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখে পৌঁছেছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রাজধানীতে স্থায়ী ঠিকানা গড়ে তোলাকে অনেকেই জীবনের বড় অর্জন হিসেবে দেখতেন।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনীতির গতি মন্থর হয়ে পড়ায় সেই আকর্ষণ কমতে শুরু করেছে। বিশেষ করে আবাসন খাতের সংকট এবং করোনা মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অনেক মানুষের আর্থিক নিরাপত্তাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। সম্পত্তির মূল্য কমে যাওয়ায় পরিবারগুলোর সঞ্চয়ের বড় অংশের মূল্যও কমেছে। একই সঙ্গে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন নিয়োগের গতি কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।
এই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে রাজধানীতে কর্মরত তরুণদের জীবনেও। প্রতিবেশী হেবেই প্রদেশের বাসিন্দা ২৯ বছর বয়সী ওয়াং লেই তাদেরই একজন। ছোটবেলায় প্রথমবার বেইজিংয়ে এসে আকাশছোঁয়া ভবন দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। তখনই স্বপ্ন দেখেছিলেন একদিন রাজধানীর সাফল্যের গল্পের অংশ হবেন।
২০২০ সালে তিনি বেইজিংয়ে এসে রিয়েল এস্টেট খাতে কাজ শুরু করেন। সে সময় এই খাতকে চীনের সবচেয়ে লাভজনক শিল্পগুলোর একটি হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই বাজারে বড় ধরনের মন্দা নেমে আসে। চাকরির চাপ ও অনিশ্চয়তায় শেষ পর্যন্ত সেই পেশা ছাড়তে বাধ্য হন তিনি।
বর্তমানে ওয়াং ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে একটি ছোট বার পরিচালনা করছেন। আয় থাকলেও রাজধানীর উচ্চ ভাড়া, দৈনন্দিন ব্যয় এবং সামাজিক জীবনের খরচ সামলানো তার জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
তার ভাষায়, আশপাশের অধিকাংশ তরুণই একই বাস্তবতার মুখোমুখি। বেতন বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য নেই। ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে।
চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ‘বেইজিং ছাড়ছি’ শিরোনামের বিভিন্ন পোস্ট এখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক তরুণ লিখছেন, একই অর্থে অন্য শহরে আরও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও মানসিক চাপমুক্ত জীবনযাপন সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা শুধু অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন নয়; এটি তরুণ প্রজন্মের মানসিকতারও পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। আগে দীর্ঘ সময় কাজ করাকে সফলতার অনিবার্য শর্ত হিসেবে দেখা হলেও এখন অনেকেই ব্যক্তিগত জীবন, মানসিক সুস্থতা এবং কাজের ভারসাম্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীনের বহুল আলোচিত ‘তাং পিং’ (Lying Flat) ধারণা। ২০২১ সালে আলোচনায় আসা এই প্রবণতায় অনেক তরুণ প্রচণ্ড প্রতিযোগিতামূলক জীবন থেকে সরে এসে তুলনামূলক সহজ, চাপমুক্ত জীবনধারা বেছে নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।
ওয়াং লেইও মনে করেন, বেইজিং ছেড়ে যাওয়া মানেই স্বপ্ন বা উচ্চাকাঙ্ক্ষার সমাপ্তি নয়। বরং বর্তমান বাস্তবতায় নিজের সামর্থ্য ও জীবনমানের সঙ্গে মানানসই পরিবেশ খুঁজে নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, একসময় সাফল্য মানে ছিল রাজধানীর সবচেয়ে উঁচু ভবনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। এখন সেই সংজ্ঞা বদলে গেছে। আজকের দিনে প্রকৃত সাফল্য হলো এমন একটি শহর খুঁজে নেওয়া, যেখানে স্বপ্নের পাশাপাশি স্বস্তি নিয়েও বাঁচা যায়।