- ১৬ জুলাই, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। নতুন দফার হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী প্রথমবারের মতো রাজধানী তেহরানের কাছাকাছি এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির উত্তরাঞ্চলসহ ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এর জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে ইরান।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার লক্ষ্যে একাধিক কমান্ড সেন্টার, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন স্থাপনা এবং উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, বন্দর আব্বাসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এ হামলা চালানো হয়। এর আগে বুধবার রাতে প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী অভিযানে গ্রেটার তুনব দ্বীপে উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাও আঘাতের মুখে পড়ে। হরমুজ প্রণালির নিকটবর্তী এই দ্বীপটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
এ ছাড়া মার্কিন বাহিনী জানিয়েছে, নৌ অবরোধ কার্যকর করার অংশ হিসেবে ইরানের খার্গ দ্বীপের দিকে অগ্রসর হওয়া একটি তেলবাহী জাহাজকে হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে অচল করে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বন্দর আব্বাস, কেশম দ্বীপ, সিরিক, চাবাহার, কোনারাক, রাস্ক, খোন্দাব, খোররামাবাদ এবং সেমনানসহ একাধিক এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। হামলার পর তেহরান, পাকদাশ্ত ও পারচিন এলাকায় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়। ইরানের সেনাবাহিনীর দাবি, আন্দিমেশক শহরের আকাশে একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক এ সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৫ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। আহতদের মধ্যে আহভাজ শহরের একটি হাসপাতালের ২১১ রোগীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে।
এদিকে পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটিতে থাকা মার্কিন বাহিনীর রাডার, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং জ্বালানি সংরক্ষণাগার লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি বাহরাইনের শেখ ঈসা বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক স্থাপনাতেও ড্রোন হামলার দাবি করেছে তারা।
জর্ডানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ইরান থেকে ছোড়া আটটি ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই প্রতিহত করা হয়েছে। অন্যদিকে ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের এরবিলে একটি মার্কিন ঘাঁটির কাছে কয়েকটি ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটেছে। যদিও ওই হামলার দায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি ইরান।
সংঘাতের মধ্যে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ গালিবাফ বলেছেন, অন্তর্বর্তী সমঝোতার শর্ত বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হলে তেহরান আরও বিস্তৃত সামরিক মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত। তার ভাষায়, ইরান বর্তমানে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে।
এদিকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখে, তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আইআরজিসির ভাষায়, “এই অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানি হয় সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, নয়তো কারও জন্যই থাকবে না।”
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, পর্দার আড়ালে ইরান শান্তি আলোচনায় আগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, পরিস্থিতির শেষ কোথায় হবে—তা নির্ভর করবে আলোচনার অগ্রগতির ওপর।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান থাকলেও শেষ পর্যন্ত এই সংঘাতের স্থায়ী সমাধান আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব।
ক্রমবর্ধমান এই উত্তেজনায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ না নেওয়া হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।