- ১৫ জুলাই, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র করে নতুন মডেল উন্মোচন করেছে ওপেনএআইয়ের সাবেক প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) মিরা মুরাতি প্রতিষ্ঠিত স্টার্টআপ থিংকিং মেশিনস ল্যাব। ‘ইঙ্কলিং’ নামের এই মডেলটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি ওপেন-ওয়েট (Open-weight) প্রযুক্তিতে তৈরি। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠান ও সফটওয়্যার ডেভেলপাররা মডেলটির মূল ওজন (weights) ডাউনলোড করে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন ও উন্নত করতে পারবেন।
বর্তমানে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি, অ্যানথ্রপিকের ক্লড কিংবা গুগলের জেমিনি মূলত নিয়ন্ত্রিত বা ক্লোজড মডেল হিসেবে পরিচালিত হয়। সেই জায়গায় ভিন্ন পথ বেছে নিয়ে থিংকিং মেশিনস দাবি করছে, ভবিষ্যতের এআই হবে এমন, যা প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজেদের কাজের ধরন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিয়ে আরও কার্যকর করে তুলতে পারবে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ইঙ্কলিং একটি ‘মিক্সচার অব এক্সপার্টস’ (Mixture-of-Experts) আর্কিটেকচারে নির্মিত। এতে মোট ৯৭৫ বিলিয়ন প্যারামিটার থাকলেও প্রতিটি কাজের জন্য একসঙ্গে মাত্র ৪১ বিলিয়ন প্যারামিটার ব্যবহার করা হয়। ফলে বিশাল আকারের মডেল হওয়া সত্ত্বেও এটি তুলনামূলক দ্রুত ও কম ব্যয়ে পরিচালনা করা সম্ভব।
ইঙ্কলিংকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে ৪৫ ট্রিলিয়ন টোকেন ব্যবহার করে, যার মধ্যে লেখা, ছবি, অডিও এবং ভিডিও—চার ধরনের তথ্যই রয়েছে। যদিও বর্তমানে এটি মূলত টেক্সটভিত্তিক আউটপুট তৈরি করতে সক্ষম। কোড লেখা, গঠিত তথ্য (Structured Data) এবং বিভিন্ন ধরনের লিখিত কনটেন্ট তৈরিতেও এটি ব্যবহার করা যাবে।
থিংকিং মেশিনস জানিয়েছে, ইঙ্কলিংয়ের লক্ষ্য শুধু দ্রুত উত্তর দেওয়া নয়; বরং যেখানে প্রয়োজন সেখানে নিজের অনিশ্চয়তার বিষয়টিও স্পষ্টভাবে জানানো। ব্যবহারকারীরা চাইলে কাজের গতি ও বিশ্লেষণের গভীরতার মধ্যে ভারসাম্যও নিজেরা নির্ধারণ করতে পারবেন।
তবে প্রতিষ্ঠানটি নিজেই স্বীকার করেছে, বর্তমানে ইঙ্কলিংকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেল হিসেবে তারা দাবি করছে না। বরং এটি এমন একটি ভিত্তি, যাকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী আরও উন্নত করতে পারবে।
এই উদ্দেশ্যেই তারা ‘টিঙ্কার’ (Tinker) নামে একটি কাস্টমাইজেশন প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের তথ্য ও দক্ষতা ব্যবহার করে ইঙ্কলিংকে নির্দিষ্ট কাজের জন্য আলাদাভাবে প্রশিক্ষণ দিতে পারবে। তবে নিরাপত্তা ও সঠিক ব্যবহারের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকেই নিতে হবে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এটি ওপেনএআই, গুগল ও অ্যানথ্রপিকের ব্যবসায়িক মডেলের সঙ্গে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করছে। যেখানে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য প্রস্তুত এআই সহকারী তৈরি করছে, সেখানে থিংকিং মেশিনস করপোরেট গ্রাহকদের জন্য নিজস্বভাবে কাস্টমাইজযোগ্য এআই প্ল্যাটফর্ম তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ হেজ ফান্ড ব্রিজওয়াটার অ্যাসোসিয়েটস-এর সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পে ওপেন-সোর্স মডেলকে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক তথ্য দিয়ে পুনঃপ্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। থিংকিং মেশিনসের দাবি, এতে তৈরি হওয়া মডেল আর্থিক বিশ্লেষণে কয়েকটি শীর্ষ বাণিজ্যিক এআই মডেলের চেয়েও ভালো ফল দিয়েছে এবং পরিচালন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। যদিও এই মূল্যায়ন স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
থিংকিং মেশিনস আরও জানিয়েছে, মাত্র নয় মাসের উন্নয়ন কাজের মধ্যেই তারা বাজারে নিজেদের প্রথম মডেল আনতে সক্ষম হয়েছে। তুলনামূলকভাবে ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রপিকের বাণিজ্যিক পর্যায়ে পৌঁছাতে কয়েক বছর সময় লেগেছিল।
তবে ইঙ্কলিং তৈরির ক্ষেত্রে অন্যান্য ওপেন-ওয়েট মডেলের আউটপুট ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু প্রশিক্ষণ ডেটা তৈরিতে ওপেন-ওয়েট মডেল ব্যবহার করা হলেও মূল মডেলটি শুরু থেকে নিজেদের উদ্যোগেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতের সংস্করণে বাইরের কোনো মডেলের সহায়তা ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বনির্ভর প্রশিক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে বলেও দাবি করেছে তারা।
এআই খাতে ওপেন প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকায় থিংকিং মেশিনসের এই পদক্ষেপ শিল্পে নতুন প্রতিযোগিতার সূচনা করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের তথ্যের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রেখে এআই ব্যবহার করতে চায়, তাদের কাছে ইঙ্কলিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।