- ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
মিয়ানমার সীমান্ত ঘিরে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থার ছত্রচ্ছায়ায় রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীপ্রধান নবী হোসেনের নেতৃত্বাধীন নেটওয়ার্ককে একটি শক্তিশালী ‘প্রক্সি’ বাহিনীতে পরিণত করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এতদিন মূলত মাদক ও অস্ত্রের কারবারকে কেন্দ্র করে সক্রিয় থাকা নবী হোসেনের নেটওয়ার্ককে এখন সীমান্তের নিরাপত্তা, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম একটি সশস্ত্র শক্তিতে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দীর্ঘদিনের বিরোধ দূরে সরিয়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে নবী হোসেনের যোগাযোগ স্থাপনের পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সক্রিয় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে একটি অভিন্ন বলয়ের মধ্যে আনার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি সূত্রগুলোর।
নবী হোসেনের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্রের ভাষ্য, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে তার নেটওয়ার্কে আধুনিক ও ভারী অস্ত্রের সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে রকেটসহ ভারী অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ, নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মাদক ব্যবসা থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ অস্ত্র কেনা, সদস্য সংগ্রহ ও যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও তাদের দাবি।
সূত্রগুলোর অভিযোগ, ইরানভিত্তিক বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীর আদলে এমন একটি নেটওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা চলছে, যার পেছনের নিয়ন্ত্রণ প্রকাশ্যে দৃশ্যমান না থাকলেও নির্দিষ্ট স্বার্থে সেটিকে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) প্রধান আতা উল্লাহ আবু আম্মার জুনুনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের কারাগারে থাকায় সংগঠনটির বর্তমান নেতৃত্বে থাকা আবদুল খালেকসহ বিভিন্ন রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের একই কাঠামোর আওতায় আনার চেষ্টা চলছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর।
তাদের মতে, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, সীমান্ত নিরাপত্তায় চাপ তৈরি এবং বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করার মতো কর্মকাণ্ড পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি করা হতে পারে।
এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ নবী হোসেনের নেটওয়ার্কে পৌঁছেছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাঠপর্যায়ের সদস্য ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে।
সূত্রগুলোর দাবি, এখন পর্যন্ত অন্তত ১৭টি পিস্তল বিভিন্ন হাত ঘুরে নবী হোসেনের নেটওয়ার্কে পৌঁছেছে। আরও ১০টি লুট হওয়া পিস্তলের একটি চালানও তার বাহিনীর কাছে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অস্ত্র এভাবে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে চলে যাওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনুসন্ধানে অস্ত্র সংগ্রহ ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের নামও সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তাদের মধ্যে উখিয়ার পালংখালী এলাকার আবু বশরের নাম রয়েছে। তিনি নবী হোসেনের মাদক নেটওয়ার্কের অর্থ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। এ ছাড়া রামুর গর্জনিয়া এলাকার গোলাম মওলা এবং ধুমধুমের ইলিয়াস মাঝিসহ আরও কয়েকজন লুট হওয়া অস্ত্র সংগ্রহ করে নবী নেটওয়ার্কে পৌঁছে দিতে সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গোয়েন্দা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, নবী হোসেনের নিয়ন্ত্রণে প্রায় তিন হাজার ভারী ও আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে জি-৩, এম-১৬, একে-৪৭ ধরনের সামরিক রাইফেল, বিভিন্ন বিদেশি পিস্তলসহ ভারী গ্রেনেড ও রকেটজাতীয় অস্ত্র থাকার দাবিও রয়েছে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য, অস্ত্রের একটি বড় অংশ মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় মজুত রাখা হয়েছে। তবে এসব তথ্যের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কেউ কেউ দাবি করছেন, নবী হোসেনের হাতে থাকা অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরীর দাবি, নবী হোসেনের নেটওয়ার্কে বিপুলসংখ্যক সদস্য সক্রিয় রয়েছে এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই কোনো না কোনোভাবে তার গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত।
নবী হোসেনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ব্যবসা, অস্ত্র সংগ্রহ ও সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালে তার নেটওয়ার্কের বিপুল অস্ত্র সংগ্রহের পরিকল্পনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।
পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে তার নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে এম-১৬, একে-৪৭, বিদেশি পিস্তল ও গ্রেনেডসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।
নবী হোসেনকে ধরিয়ে দিতে ২০২২ সালে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তার ভাই মো. কামাল গুলিতে নিহত হওয়ার পর ক্যাম্পের ভেতরে নবী গোষ্ঠী কিছুটা চাপের মধ্যে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে নবী হোসেনও বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। পরে তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বলে পুলিশ ও রোহিঙ্গা নেতাদের বিভিন্ন সূত্রের দাবি।
২০১৮ সালের দিকে মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান এনে টেকনাফ ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় সরবরাহের মাধ্যমে তিনি একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে তার নেতৃত্বে একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে ওঠে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয়দের ভাষ্য।
বিভিন্ন সময়ে বালুখালীসহ কয়েকটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তার নেটওয়ার্কের প্রভাব থাকার তথ্য সামনে এসেছে। মাদক ব্যবসার পাশাপাশি অস্ত্র সংগ্রহ ও সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে একাধিক গোষ্ঠীর সহযোগিতা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্র জানিয়েছে, নবী হোসেনকে গ্রেপ্তারে অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় তার গতিবিধি এবং সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।
৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নবী হোসেনের গোষ্ঠীসহ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এসব তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলামের মতে, কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র থাকার তথ্য সত্য হলে তা শুধু ক্যাম্প নয়, সীমান্ত ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়; অস্ত্রের উৎস, অর্থের জোগান, মজুতস্থল এবং পুরো সরবরাহ নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সীমান্তে একের পর এক অস্ত্রের উপস্থিতি, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগ এবং মাদকভিত্তিক অর্থের প্রবাহ সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।