Saturday, October 31, 2026

জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন সমঝোতার অভিযোগ বিএনপির


প্রতীকী ছবিঃ বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীর ও আওয়ামী লীগ (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। একসময় আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত এই দুই দল এখন পরস্পরের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন সমঝোতার অভিযোগ তুলছে। বিএনপির দাবি, সরকারকে অস্থিতিশীল করতে জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের যোগাযোগ রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত বলছে, জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে সরাতেই এমন অভিযোগ সামনে আনছে ক্ষমতাসীন দল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে আসছে, এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পেছনে শুধু আওয়ামী লীগকে ঘিরে সন্দেহ নয়, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে দুই দলের গভীর মতপার্থক্যও কাজ করছে। বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন এবং সংসদে সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে অচলাবস্থার মধ্যে আওয়ামী লীগকে ঘিরে অভিযোগ রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর জামায়াতের সমর্থনে সরকার গঠন করেছিল বিএনপি। পরে ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয় জামায়াত। বিএনপি ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়ও দুই দলকে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে একসঙ্গে দেখা গেছে।

তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে। বিএনপি এখন ক্ষমতায়, আর জামায়াত বিরোধী দলে। এই নতুন বাস্তবতায় দুই দলের মধ্যে অবিশ্বাসও প্রকাশ্যে আসছে।

সম্প্রতি রাজশাহীতে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, দেশের কয়েকটি শিল্পকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির পেছনে আওয়ামী লীগের অর্থায়ন রয়েছে। সেই অর্থের সহায়তায় একটি রাজনৈতিক দল দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর বিএনপির অন্য নেতারাও একই ধরনের অভিযোগ তুলতে শুরু করেন। তবে জামায়াত এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাতের অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাঁর ভাষ্য, আওয়ামী লীগ জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি দিয়েছে, দলীয় কার্যালয় বন্ধ রেখেছে এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দিয়েছে। এমন একটি দলের সঙ্গে জামায়াতের সমঝোতা হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

উল্টো আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির আঁতাতের অভিযোগ তোলেন তিনি। আযাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ পেলেও জামায়াতকে দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ ও বাধাগ্রস্ত করে রাখা হয়েছিল।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করে দেওয়ার বিষয়ে জামায়াতের আগের কিছু বক্তব্য থেকেই জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, জামায়াতের চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের পেছনেও আওয়ামী লীগের সমর্থন থাকতে পারে।

রিজভীর ভাষ্য, সরকারকে দ্রুত ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করতে গিয়ে জামায়াত এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যার পরিণতি দেশের জন্য বিপজ্জনক হবে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে বিএনপি এখনো প্রকাশ্যে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেনি।

বিএনপির সন্দেহের আরেকটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিরোধ। বিএনপির অভিযোগ, জামায়াত ও তাদের সঙ্গে থাকা দলগুলো সংস্কার প্রশ্নে এমন অবস্থান নিয়েছে, যাতে সরকার ও সংসদে অচলাবস্থা তৈরি হচ্ছে। এর ফলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ক্ষমতাসীন দল।

বিএনপি ও জামায়াতের বর্তমান দূরত্বের বড় কারণ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধানের সংস্কার পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধ।

জামায়াতসহ ১১ দলীয় ঐক্য গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ হুবহু বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি সনদের যেসব বিষয়ে আপত্তি বা নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, সেগুলো বাদ দেওয়ার পক্ষে।

সংবিধান নিয়েও দুই পক্ষের অবস্থান আলাদা। জামায়াত ও তাদের সঙ্গে থাকা দলগুলো সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন বা আমূল সংস্কার চায়। বিএনপি চায় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে।

এই মতপার্থক্যের কারণে সংসদে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সরকারের সমঝোতা হয়নি। বিরোধী দলগুলো সংসদীয় প্রক্রিয়া বর্জন করায় সংস্কার নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

বিএনপি আশঙ্কা করছে, বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য ছাড়া একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিলে তা রাজনৈতিক ও নৈতিক বৈধতার সংকট তৈরি করতে পারে। এ কারণে সরকার সমঝোতার ওপর জোর দিচ্ছে। তবে বিরোধী দলগুলো নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় সেই সমঝোতা এখনো সম্ভব হয়নি।

রুহুল কবির রিজভীর মতে, সংবিধান নিয়ে বিরোধী দলগুলোর কঠোর অবস্থান গণতান্ত্রিক শক্তিকে দুর্বল করতে পারে এবং পরাজিত শক্তির রাজনীতিতে ফিরে আসার পথ তৈরি করতে পারে।

বিএনপির অভিযোগের জবাবে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সরকার দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হয়ে জনগণের মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে আওয়ামী লীগকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে।

আযাদের অভিযোগ, বিএনপি সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। তাই রাজনৈতিক বিভ্রান্তি তৈরি করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির সমঝোতার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে জামায়াতও প্রকাশ্যে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করেনি।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। শেখ হাসিনাসহ দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের বিষয়ে দলটির বক্তব্য জানতে চাইলে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাসিম বলেন, আওয়ামী লীগ কোনো দলের সঙ্গে সমঝোতা করে কাজ করছে না।

তিনি বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য নেই বলেও মন্তব্য করেন। নাসিমের দাবি, আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে না; তারা বাংলাদেশের জনগণের জন্য কাজ করছে।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাতের অভিযোগের পেছনে বিএনপির গোয়েন্দা তথ্যের দাবি থাকলেও তা এখনো প্রকাশ্যে যাচাই করা যায়নি। জামায়াতও অভিযোগ অস্বীকার করছে। আওয়ামী লীগ বলছে, কোনো দলের সঙ্গেই তাদের সমঝোতা নেই।

এ অবস্থায় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠছে, জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ায় বিএনপি কি জামায়াতের ওপর পরোক্ষ চাপ তৈরি করতে আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গ সামনে আনছে? নাকি সরকার যে গোয়েন্দা তথ্যের কথা বলছে, তার ভিত্তিতেই অভিযোগগুলো করা হচ্ছে?

এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি। তবে আওয়ামী লীগকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দুই দলের মধ্যে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক অবিশ্বাসেরই প্রতিফলন।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন