- ৩০ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
গরু জবাইয়ের মামলায় তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন ভারতের গুজরাটের একটি আদালত। সাজা ঘোষণার সময় রায়ে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদ ও মনুস্মৃতির বিভিন্ন উদ্ধৃতি তুলে ধরেছেন বিচারক। গরুর ধর্মীয় তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি একে শুধু প্রাণী নয়, বরং জাগতিক সমৃদ্ধি ও ধর্মীয় বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে বিচারিক রায়ে ধর্মীয় ব্যাখ্যার ব্যবহার নিয়ে দেশটিতে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
গুজরাটের গান্ধীনগর জেলার কালোল দায়রা আদালতের অতিরিক্ত দায়রা বিচারক ব্রিজেশকুমারী রামেশ্বর সিং রাজপুত তিন আসামির বিরুদ্ধে এ রায় দেন। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন ওয়াসিম কুরেশি, মোহাম্মদ রফিক কুরেশি এবং আশফাক ওরফে সালমান। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে তিন লাখ রুপি করে জরিমানাও করা হয়েছে।
রায়ে বিচারক উল্লেখ করেন, হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও বেদ অনুসারে গরুকে বিশ্বমাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হিন্দু শাস্ত্রের ব্যাখ্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, গরুর শরীরে ৩৩ কোটি দেবদেবীর অবস্থান এবং এর চারটি পা চার বেদের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
বিচারক বেদ, মনুস্মৃতি ও অন্যান্য প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে গরুর উৎপত্তি ও ধর্মীয় গুরুত্বের বিষয়টিও ব্যাখ্যা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তপস্যার শক্তিতে অমৃতের ফোঁটা পৃথিবীতে পড়ার সময় দেবগাভি কামধেনুর আবির্ভাব হয়েছিল। তাঁকেই পৃথিবীর সব গো-প্রজাতির আদি উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মনুস্মৃতির প্রসঙ্গ টেনে বিচারক বলেন, গরু হিন্দু ধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ঋগ্বেদে গরুকে ‘অঘন্য’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যার অর্থ হত্যা করা উচিত নয়। রায়ের প্রথম কয়েক পৃষ্ঠায় হিন্দু ধর্মে গরুর অবস্থান ও তাৎপর্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট গান্ধীনগর জেলার জামলা গ্রামের একটি বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে ২৭৭ কেজি গরুর মাংস উদ্ধার করা হয়। এ সময় মাংসের পাশাপাশি গরু জবাইয়ে ব্যবহৃত ছুরি এবং মাংস পরিবহনের একটি গাড়িও জব্দ করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অসুস্থ ও দুধ দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া গরু কিনে জবাই করতেন এবং পরে সেই মাংস সরবরাহ করতেন। মামলায় ৫৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও ১৮টি নথি পর্যালোচনার পর তিনজনকে দোষী সাব্যস্ত করেন আদালত।
গুজরাটে গরু জবাইয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে। নরেন্দ্র মোদি রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে ২০১১ সালে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ২০১৭ সালে ১৯৫৪ সালের গুজরাট প্রাণী সংরক্ষণ আইন সংশোধন করে গরু জবাইয়ের অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়।
সংশোধিত আইনে গরুর মাংস পরিবহন, সংরক্ষণ কিংবা বিক্রির অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে। গরু জবাইয়ের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান চালু করা ভারতের প্রথম রাজ্য গুজরাট।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গরু জবাইয়ের ওপর সম্পূর্ণ বা আংশিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বিশেষ করে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে এ বিষয়ে কঠোর আইন কার্যকর। তবে অধিকাংশ রাজ্যে এ অপরাধের শাস্তি তিন থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
বিচারকের রায়ে ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার বিস্তৃত ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা। তাঁদের বক্তব্য, ভারতের সংবিধান দেশটিকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আদালতের দায়িত্ব প্রচলিত আইন, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও সংবিধানের ভিত্তিতে বিচার করা। সেখানে কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাখ্যা বা প্রবচনকে বিচারিক রায়ের অংশ করা কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এ বিতর্কের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রসঙ্গও যুক্ত হয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সম্প্রতি মনুস্মৃতির সমালোচনা করে বলেছিলেন, গ্রন্থটিতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রতিফলন রয়েছে, যেখানে নারীদের অধস্তন অবস্থানে রাখার ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, নারীদের এমন বৈষম্যমূলক চিন্তাধারা প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা উচিত।
রাহুল গান্ধীসহ কংগ্রেসের কয়েকজন নেতা মনুস্মৃতিকে সামাজিক বৈষম্যের ভিত্তি হিসেবে সমালোচনা করে আসছেন। এমন প্রেক্ষাপটে একটি বিচারিক রায়ে গ্রন্থটির উদ্ধৃতি ও প্রশংসাসূচক ব্যাখ্যা রাজনৈতিক আলোচনাকে আরও উসকে দিয়েছে।
অন্যদিকে গুজরাটের উপমুখ্যমন্ত্রী হর্ষ সাংভি আদালতের রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, এ রায়ের মাধ্যমে রাজ্যের সর্বত্র স্পষ্ট বার্তা যাবে যে গরু জবাইয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আইনের আওতা থেকে রেহাই পাবেন না।
তিনি আরও বলেন, গরুকে রক্ষা ও লালন-পালন করা হিন্দুদের পবিত্র দায়িত্ব এবং গুজরাট সরকারের এ বিষয়ে অবস্থান দৃঢ়। মামলার তদন্ত ও তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহে ভূমিকা রাখার জন্য তিনি গান্ধীনগর পুলিশ এবং সরকারি আইনজীবীদের প্রশংসা করেন।
তবে রায়ের আইনি ভিত্তি ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় ব্যাখ্যার ব্যবহার নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা, বিচার বিভাগের ভূমিকা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে আইনের সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।