- ৩০ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের বিরুদ্ধে আইনি তৎপরতা জোরদার করেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। আলাস্কায় সিনেট নির্বাচনের ফল ঘোষণার প্রক্রিয়া আটকে দেওয়ার আবেদন জানিয়ে নতুন করে মামলা সংশোধন করেছে বিচার বিভাগ। অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়ায় অ-মার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়ার অভিযোগ তদন্তে নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে সমন পাঠানো হয়েছে।
আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনকে ঘিরে ওয়াশিংটন ও অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট মেয়াদের শেষ দুই বছরে প্রশাসনের নীতি ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপরও এই নির্বাচনের বড় প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, অঙ্গরাজ্যগুলো নিজ নিজ নির্বাচনের আয়োজন ও পরিচালনা করে। সে ব্যবস্থার মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের এমন আইনি হস্তক্ষেপকে নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন থেকে আরও আইনি চ্যালেঞ্জ আসতে পারে এমন আশঙ্কায় তাঁরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আলাস্কায় বৃহস্পতিবার সংশোধিত মামলা দায়ের করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। এতে বলা হয়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ড্যান সুলিভান অল্প ব্যবধানে পরাজিত হলে নির্বাচনের ফল প্রত্যয়ন বা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদনের প্রক্রিয়া বন্ধ রাখতে হবে।
বিচার বিভাগের অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলার নির্বাচনী প্রচারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা রিপাবলিকান প্রার্থীর সমান নামের একজন প্রার্থীকে নির্বাচনে দাঁড় করানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল ভোটারদের বিভ্রান্ত করে রিপাবলিকান প্রার্থীর ভোট কমিয়ে দেওয়া।
সংশোধিত মামলায় বিচার বিভাগ অভিযোগ করেছে, পেলটোলার প্রচারশিবিরের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আলাস্কার ভোটারদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে একটি সাজানো নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন।
আলাস্কার রিপাবলিকান গভর্নর মাইক ডানলিভি এ ঘটনায় রাজ্য পর্যায়ে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। নিউজ নেশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে তা সিনেটে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আসন গ্রহণের বিষয়েও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে আলাস্কার নির্বাচন কর্মকর্তারা আদালতে দেওয়া এক আবেদনে বিচার বিভাগের সংশোধিত মামলাকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, এ ধরনের মামলা রাজ্যের নির্বাচনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলছে, যা জনস্বার্থের পরিপন্থী।
মেরি পেলটোলার প্রচারশিবির তাৎক্ষণিকভাবে নতুন অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে এর আগে তারা বলেছিল, ড্যান সুলিভানের নামে প্রচার চালানো কোনো নির্বাচনী উদ্যোগের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা নেই। ডেমোক্র্যাটিক সিনেটরিয়াল ক্যাম্পেইন কমিটিও এ অভিযোগে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে। একই সঙ্গে তাদের দাবি, অন্য কয়েকটি নির্বাচনে রিপাবলিকানরাও নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা দিতে একই ধরনের কৌশল নিয়েছে।
ড্যান সুলিভানের নামের সঙ্গে মিল থাকা প্রার্থী ড্যানিয়েল জে. সুলিভান এর আগে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা বা ভোট ভাগ করার উদ্দেশ্য থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
আলাস্কার নির্বাচন ও প্রচারাভিযানবিষয়ক আইনজীবী স্কট কেন্ডাল মনে করেন, নামের বিভ্রান্তি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলার জন্যও ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবে তাঁর মতে, সিদ্ধান্তহীন ভোটারের সংখ্যা এখন কম থাকায় এ বিতর্ক নির্বাচনের ফলাফলে বড় পরিবর্তন আনবে—এমন সম্ভাবনা কম।
অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়ায় অ-মার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়ার অভিযোগে তদন্তের অংশ হিসেবে লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে গ্র্যান্ড জুরি সমন পাঠিয়েছে বিচার বিভাগ।
রয়টার্সের দেখা নথি অনুযায়ী, গত সপ্তাহে লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি রেজিস্ট্রার-রেকর্ডারের কার্যালয় এসব সমন গ্রহণ করে। বৃহস্পতিবার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির রেজিস্ট্রার-রেকর্ডার ডিন লোগান এক বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় বিচার বিভাগের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, প্রতিটি পর্যায়েই বিচার বিভাগ বিরোধপূর্ণ ও সংঘাতমূলক অবস্থান নিয়েছে। তবে নির্বাচন কর্মকর্তারা অঙ্গরাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের আইন মেনেই দায়িত্ব পালন করছেন।
সমন পাঠানোর বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হয়নি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের একজন মুখপাত্র। তবে তিনি বলেছেন, অ-মার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়ার বিষয়টি ফৌজদারি আইনের আওতায় মোকাবিলা করা উচিত এ বিষয়ে ক্যালিফোর্নিয়া ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে মতৈক্য রয়েছে।
নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকতে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলের নেতারাই প্রচার জোরদার করেছেন। শুক্রবার ফ্লোরিডায় নির্বাচনী সমাবেশে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। ২০২৪ সালের নির্বাচনে রাজ্যটিতে বড় ব্যবধানে জয় পেলেও এবার আগাম ভোটের প্রবণতা ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকেছে।
চলতি সপ্তাহে মিসিসিপি ও সাউথ ক্যারোলাইনায় প্রচার চালানোর পর ফ্লোরিডায় যাচ্ছেন তিনি। তবে সপ্তাহান্তে কানসাস ও আইওয়ায় নির্ধারিত সমাবেশ বাতিল করেছেন ট্রাম্প। রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে তিনি ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে প্রায় ২০টি প্রচার অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের কাছে পরাজিত সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস শুক্রবার জর্জিয়ার আটলান্টায় ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে প্রচার চালাবেন। বৃহস্পতিবার জর্জিয়ার ম্যাকনে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, গত দেড় বছর সময়টা কঠিন গেলেও এখন অনেক কিছু করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনের আগেই যুক্তরাষ্ট্রে আগাম ভোটের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার ইলেকশন ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৪ কোটি ৪০ লাখের বেশি ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মোট আগাম ভোটের সংখ্যার তুলনায় এটি ২০ লাখেরও কম ব্যবধান।
ওহাইও অঙ্গরাজ্যের কলম্বাসে বৃহস্পতিবার একটি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করা নির্বাচন কর্মকর্তা অ্যান্টোন হোয়াইট জানান, ২০২২ সালের একই সময়ের তুলনায় এবার ভোটারের উপস্থিতি প্রায় দ্বিগুণ।
ভোট দিতে অপেক্ষমাণ ৬২ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত আয়ভিত্তিক জীবনযাপনকারী সাদিরাহ সিমন্স বলেন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। পরিবর্তন চাইলে ভোট দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের প্রায় ১০টি আসনে এবার হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পুনরুদ্ধার করতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি আসন বাড়াতে হবে। আলাস্কার মতো গুরুত্বপূর্ণ কোনো আসনের ফল নিয়ে দীর্ঘ আইনি জটিলতা তৈরি হলে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে, তা নির্ধারণে কয়েক সপ্তাহও লেগে যেতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধ বন্ধে প্রেসিডেন্টের ওপর চাপ বাড়ানোর পথও তৈরি হতে পারে। ফলে ৩ নভেম্বরের নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নির্ধারণেই নয়, ট্রাম্প প্রশাসনের আগামী দিনের রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী অবস্থানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।