Friday, October 30, 2026

ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রাশিয়ান হামলায় নিহত অন্তত ২০


ছবিঃ ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে ইউক্রেনের দিনিপ্রোতে যেখানে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালাচ্ছে একটি রেলওয়ে স্টেশনে রুশ ড্রোন হামলার পর জরুরি পরিষেবার কর্মীরা কাজ করছেন। (সংগৃহীত । রয়টার্স)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলীয় শহর ডিনিপ্রোর প্রধান রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে চালানো ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৪ জন। এ ছাড়া উত্তরের চেরনিহিভ ও মধ্যাঞ্চলের ক্রেমেনচুকে হামলায় আরও পাঁচজন নিহত হয়েছেন। রাজধানী কিয়েভে গভীর রাতে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) এসব হামলার ঘটনা ঘটে। ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে একের পর এক হামলায় বেসামরিক মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন এলাকায় ছয় দিনের একটি স্থানীয় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে।

ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী সেরহি কোরেতস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, ট্রেন, রেলস্টেশন ও আবাসিক ভবনে হামলা চালিয়ে রাশিয়া সাধারণ মানুষকে নিশানা করছে। এ ধরনের সন্ত্রাসের কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।

রাজধানী কিয়েভে স্থানীয় সময় রাত ১১টার কিছু আগে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। শহরের সামরিক প্রশাসন জানিয়েছে, হামলায় একজন নিহত হয়েছেন। এ সময় কয়েকটি গুদামে আগুন ধরে যায়। ডিনিপ্রো নদীর পূর্ব তীরের একটি ভবনও ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর কয়েক ঘণ্টা আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রুশ হামলাগুলোকে অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও পরিকল্পিত বলে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, যখন সবাই উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছে, তখনই এ ধরনের হামলা চালানো হচ্ছে।

জেলেনস্কি আরও সতর্ক করে বলেন, রাশিয়া নতুন করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন গোয়েন্দা তথ্য ইউক্রেনের হাতে রয়েছে। এসব হামলা প্রতিহত করতে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানান।

ডিনিপ্রোর প্রধান রেলস্টেশনে হামলার সময় একটি যাত্রীবাহী ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেলওয়ে সংস্থা উক্রজালিজনিতসিয়া জানিয়েছে, জেটচালিত একটি ড্রোন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে আঘাত হানে। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

হামলার পর প্ল্যাটফর্মজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ধ্বংসাবশেষ। বিভিন্ন স্থানে রক্তের দাগ দেখা যায়। উদ্ধারকর্মী ও পুলিশ সদস্যরা হতাহতদের সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি মরদেহ কালো ব্যাগে ভরে নিয়ে যান। এ সময়ও এলাকায় বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজছিল।

হামলার সময় স্টেশনের ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন ৬৭ বছর বয়সী স্বিতলানা শেরবাক। তিনি বলেন, কেন সাধারণ মানুষের ওপর এমন হামলা চালানো হচ্ছে, তা তিনি বুঝতে পারছেন না।

ডিনিপ্রোতে আরেকটি হামলায় একটি শিক্ষার্থীদের আবাসিক ভবনে আগুন ধরে যায়। আঞ্চলিক গভর্নর ওলেক্সান্দর হানজা জানান, দিনভর হামলার কারণে শহরটির প্রায় তিন লাখ ৫০ হাজার পরিবার বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ডিনিপ্রোর বাইরে ইউক্রেনের আরও কয়েকটি শহরে হামলা চালানো হয়েছে। উত্তরের চেরনিহিভ শহরের কেন্দ্রীয় সড়কে ড্রোন হামলায় দুই কিশোরী নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় চার শিশুসহ অন্তত ২৩ জন আহত হয়েছেন।

শহরটির সামরিক প্রশাসনের প্রধান দিমিত্রো ব্রিঝিনস্কি বলেন, হামলার শিকার ব্যক্তিরা ছিলেন সাধারণ মানুষ। কেউ কাজে যাচ্ছিলেন, কেউ দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে বাইরে বের হয়েছিলেন, আবার কেউ দিনের পরিকল্পনা নিয়ে চলাফেরা করছিলেন।

মধ্যাঞ্চলীয় ক্রেমেনচুক শহরে আবাসিক ভবন ও ব্যক্তিগত বাড়িতে হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন। আঞ্চলিক গভর্নর এ তথ্য জানিয়েছেন।

এ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়ায় পৃথক তিনটি হামলায় শহরের বাসগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এতে ছয়জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে এসব হামলার ঘটনা এমন সময়ে ঘটল, যখন যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর উদ্যোগ চলছে। আগামী মাসে ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক আয়োজনের সম্ভাবনা রয়েছে। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা মস্কোর ওপর চাপ বাড়াতে দেশটির আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন।

এদিকে দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ছয় দিনের একটি স্থানীয় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। এর আওতায় রুশ নিয়ন্ত্রণে থাকা ওলেশকি শহরে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে শহরটি যুদ্ধাঞ্চলের মধ্যে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।

যুদ্ধবিরতি ও মানবিক কার্যক্রম নিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন প্রায় একই ধরনের বিবৃতি দিয়েছে। উভয় পক্ষ জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট এলাকায় মাইন অপসারণের কাজ শেষ হয়েছে। এর ফলে শহরটিতে ত্রাণ পৌঁছানো এবং ইচ্ছুক বাসিন্দাদের নিরাপদে বের হয়ে আসার সুযোগ তৈরির কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে।

তবে ইউক্রেনের রেল যোগাযোগসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রয়েছে। এসব হামলায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

রাশিয়া নিয়মিতভাবে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে হামলা চালিয়ে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটালেও মস্কো বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই সংঘাতের অবসানে নতুন উদ্যোগ চললেও বৃহস্পতিবারের হামলাগুলো শান্তি প্রচেষ্টার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন