Friday, October 30, 2026

ওয়েস্ট ব্যাংকের হেবরনে ইসরায়েলি অবরোধে ঘরছাড়া প্রায় পাঁচ হাজার ফিলিস্তিনি


ছবিঃ ইসরায়েল-অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরনে, চলমান ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের মধ্যে একটি এলাকা থেকে ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আয়োজিত প্রতিবাদ কর্মসূচিতে একজন ইসরায়েলি সেনাকে এক ফিলিস্তিনি ব্যক্তির দিকে ইঙ্গিত করতে দেখা যাচ্ছে, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ (সংগৃহীত । আল জাজিরা /মুসা কাওয়াসমা/রয়টার্স)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

অধিকৃত পশ্চিম তীরের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর হেবরনে ইসরায়েলি সামরিক অবরোধের কারণে বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন প্রায় পাঁচ হাজার ফিলিস্তিনি। অবরোধের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৬৯ জনে। তাঁদের মধ্যে শিশু, প্রবীণ, দীর্ঘমেয়াদি রোগী, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও রয়েছেন।

আল জাজিরার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, শহরটির প্রবেশপথের ১০টি স্থানে ইসরায়েলি বাহিনীর অবরোধের কারণে স্বাভাবিক চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। পৌরসভা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, বর্তমানে ৭৮০টি পরিবার বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে। এ সংখ্যা হেবরনের প্রায় আড়াই লাখ বাসিন্দার ২ শতাংশের সমান।

বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে ৪৪১ জন প্রবীণ, দুই বছরের কম বয়সী ৩৩৬ শিশু এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ৩১২ জন রয়েছেন। এ ছাড়া দুই শতাধিক অন্তঃসত্ত্বা ও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন এমন নারী এবং ৪৪ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছেন।

হেবরনের মেয়র ইউসুফ আল-জাবারি আল জাজিরাকে বলেন, হাজারো মানুষকে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। মধ্যরাতের পর শিশুদের কান্নার দৃশ্য বিশ্ববাসী দেখেছে। আনাদোলু সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি পরিস্থিতিকে ভয়াবহ অবরোধ ও সম্মিলিত শাস্তি হিসেবে বর্ণনা করেন।

গত ২৪ অক্টোবর মেয়র জানিয়েছিলেন, তখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ২০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে এ সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।

গত ২৩ অক্টোবর শুক্রবার হেবরনে দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত এবং আরও তিনজন আহত হওয়ার পর সামরিক অবরোধ শুরু হয়। পরে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে ওই দুই হামলাকারী নিহত হন।

এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হেবরন অবিলম্বে বন্ধ করে দিতে নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়ার কথা জানান। একই সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে পূর্ণাঙ্গ অবরোধের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলি পরিভাষায় ‘জুদেয়া ও সামারিয়া’ বলা হয়।

নেতানিয়াহু হেবরনের পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সন্ত্রাসী তৎপরতা ঠেকাতে অভিযান চালানো হচ্ছে। এ অভিযানের অংশ হিসেবে তল্লাশি, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আটক এবং অস্ত্র জব্দ করা হচ্ছে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেছেন, হামাসের অবকাঠামো ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের বাড়িতে ফিরতে দেওয়া হবে না। তবে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটের এক প্রতিবেদনে সেনাবাহিনীর বরাতে বলা হয়েছে, অস্ত্র উদ্ধারের অভিযানে সীমিত অগ্রগতি হয়েছে। দীর্ঘ সময় বাসিন্দাদের বাড়ি থেকে দূরে রাখার ক্ষেত্রে আইনি জটিলতাও রয়েছে।

হেবরন পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, উচ্ছেদের জন্য নির্ধারিত এলাকার আয়তন প্রায় শূন্য দশমিক ৩৫ বর্গকিলোমিটার। প্রায় ৪৯টি ফুটবল মাঠের সমান এ এলাকায় ৫০০টির বেশি পরিবারের অন্তত আড়াই হাজার মানুষের বসবাস।

বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর মধ্যে ২৮৩টি আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। তবে ২৬৬টি পরিবার এমন জায়গায় অবস্থান করছে, যেগুলোকে পৌরসভা অনিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অধিকাংশ পরিবার কাছাকাছি ইসা এলাকার মতো পাড়াগুলোতে স্বজন বা পরিচিতদের বাড়িতে উঠেছে। সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে কোনো পরিবার আশ্রয় নেয়নি বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মাত্র ২৩টি পরিবার ভাড়া বাসা নিতে পেরেছে।

আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হেবরনের কেন্দ্র থেকে ২ দশমিক ৪ থেকে ৭ দশমিক ৬ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে থাকা ১০টি প্রবেশপথ বন্ধ করে শহরটিকে কার্যত ঘিরে রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী।

শহরের উত্তর দিকে হালহুল, নবী ইউনুস ও রাস আল-জোরা; উত্তর-পূর্বে বেইত আইনুন এবং উত্তর-পশ্চিমে বীর আল-মাহজার এলাকায় অবরোধ রয়েছে। পূর্ব ও দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথ জাবাল জুহার, আল-ফাহস, কালকাস, আল-হারায়িক ও দুরা এলাকায় বন্ধ রাখা হয়েছে।

শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য আলাদা এলাকাও ঘিরে রাখা হয়েছে। এর আয়তন অন্তত শূন্য দশমিক ২৯ বর্গকিলোমিটার, যা প্রায় ৪০টি ফুটবল মাঠের সমান।

অভিযানের প্রথম দুই দিন, ২৩ ও ২৪ অক্টোবর, শহরের পশ্চিম প্রবেশপথ ফারশ আল-হাওয়া এলাকায় তিনটি অ্যাপার্টমেন্টবিশিষ্ট একটি আবাসিক ভবন গুঁড়িয়ে দেয় ইসরায়েলি বাহিনী। একই এলাকায় একটি সিরামিক কারখানা ও গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকানগুলোও লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এ ছাড়া প্রায় ৭ হাজার বর্গমিটার জমি বুলডোজার দিয়ে সমতল করা হয়েছে।

২৩ অক্টোবর শুক্রবার মধ্যরাতে আল-জালদা ও আইন দেইর বাহা এলাকার বাসিন্দাদের মাইকিং করে বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আনাদোলুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযানের প্রথম দুই দিনে কয়েকটি বাড়িকে সামরিক ব্যারাকে পরিণত করে সেখানে ইসরায়েলি পতাকা উত্তোলন করা হয়।

ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটির (পিপিএস) তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের প্রথম ছয় দিনে হেবরন গভর্নরেটের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ১১০ জন ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে সাত শিশু, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি এবং সাবেক বন্দিরাও রয়েছেন।

এ ছাড়া তিন নারীকে আটক করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে দুজনকে ছেড়ে দেওয়া হলেও একজনকে আল-মাসকোবিয়েহ আটককেন্দ্রে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাখা হয়েছে। ইসরায়েলি সেনা হত্যার ঘটনায় জড়িত দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর আট স্বজনকেও আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে।

আনুষ্ঠানিক আটকের বাইরেও সামরিক অভিযানের সময় শত শত ফিলিস্তিনিকে রাস্তাঘাট, তল্লাশিচৌকি ও বাড়িঘরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পিপিএস। এসব জিজ্ঞাসাবাদের সময় মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগও করেছে সংগঠনটি।

এ পর্যন্ত শহরের ৫০০টির বেশি স্থানে তল্লাশি চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। সেনাবাহিনীর দাবি, এক হামলাকারীর বাড়ির কাছে মাটির নিচে ১৫ মিটার গভীর একটি গর্তে ইলেকট্রনিক যন্ত্র পাওয়া গেছে। তবে বাড়ির মালিক এ দাবি অস্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ওই গর্তটি মূলত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এলাকায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় এটি ব্যবহার করা হয়। বাড়িটি দুই হামলাকারীর কারও নয় এবং তাঁদের বাসস্থান থেকে ১০০ মিটারেরও বেশি দূরে।

সামরিক অবরোধের প্রভাব পড়েছে হেবরনের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনেও। হেবরন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির হিসাব অনুযায়ী, অবরোধের কারণে প্রতিদিন বাণিজ্যিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ইসরায়েলি শেকেল, যা প্রায় ৩৮ লাখ মার্কিন ডলারের সমান।

চেম্বারের সহসভাপতি আদনান আল-নাতশেহ জানিয়েছেন, বিভিন্ন কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে। হেবরন গভর্নরেটে প্রায় ৩ হাজার ৫০০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে প্লাস্টিক ও দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনকারী কারখানার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ফিলিস্তিনি বাজারের স্বর্ণের কারখানা ও কর্মশালার প্রায় ৭০ শতাংশও এ অঞ্চলে অবস্থিত।

অবরোধের কারণে বাণিজ্যিক পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু ফারশ আল-হাওয়া এলাকায় স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ ২০ লাখ শেকেলের বেশি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এ পরিস্থিতি পশ্চিম তীরে আগে থেকেই চলমান সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে নতুন চাপ যুক্ত করেছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে হেবরন গভর্নরেটে ২৭২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১২২টি ছিল ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা। একই সময়ে ১৯টি উচ্ছেদ অভিযানে ৯১টি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পশ্চিম তীরের গভর্নরেটগুলোর মধ্যে ওই মাসে স্থাপনা ধ্বংসের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হেবরন।

অবরোধ, উচ্ছেদ, গ্রেপ্তার ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে হেবরনের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের নিয়ে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো মানবিক সংকটের মুখে পড়েছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন