- ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
স্পেনে একের পর এক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার পর দেশটির রেলপথের নিরাপত্তা ও অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলোর বেঁচে ফেরা যাত্রী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নতুন রেললাইন নির্মাণে গুরুত্ব দিলেই হবে না, বিদ্যমান ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং আধুনিক নিয়ন্ত্রণপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
২০১৩ সালে উত্তর-পশ্চিম স্পেনের সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলার কাছে অ্যাংরোইসে দ্রুতগতির ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে ৮০ জন নিহত হন। দেশটির ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনা। ওই দুর্ঘটনায় আহতদের একজন ক্রিস্তোবাল গনসালেজ। ঘটনার ১৩ বছর পরও তিনি শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি মানসিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন।
গনসালেজের ভাষ্য, দুর্ঘটনার পর তিনি বেঁচে ফিরলেও সেই দিনের স্মৃতি এখনো তাঁকে তাড়া করে। তাঁর মতে, স্পেনে একের পর এক ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটলেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও প্রাণহানির আশঙ্কা থেকে যাবে।
বুধবার (২৯ অক্টোবর) মধ্য স্পেনের তোলেদোর কাছের উর্দা এলাকায় দুটি ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৬৯ জন নিহত হন। এর মাত্র ১০ মাস আগে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দক্ষিণ স্পেনের কর্দোবার কাছে আদামুজ এলাকায় দুটি ট্রেনের সংঘর্ষে প্রাণ হারান ৪৬ জন। একই বছরে পরপর দুটি বড় দুর্ঘটনা এবং ২০১৩ সালের স্মৃতি নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গনসালেজ বলেন, অ্যাংরোইস, আদামুজ ও উর্দা—তিনটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এ ধরনের ঘটনা আবার ঘটবে। তাঁর মতে, অ্যাংরোইস দুর্ঘটনায় চালকের অতিরিক্ত গতি, আদামুজে রেললাইনের ত্রুটি এবং উর্দার ঘটনায় মানবিক ভুল ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সমস্যার বিষয় সামনে এসেছে। দুর্ঘটনার কারণ যা-ই হোক, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
২০১৩ সালের দুর্ঘটনার সময় বন্ধু অস্কারের সঙ্গে সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলার উদ্দেশে যাচ্ছিলেন গনসালেজ। তিনি ছিলেন ট্রেনটির সামনের বগিতে। তাঁর ভাষায়, ট্রেনটি হঠাৎ লাইন থেকে ছিটকে গিয়ে একটি ঢালে আছড়ে পড়ে। দুর্ঘটনার পরও তিনি ট্রেনের ভেতরে থেকে আহত ও মৃত্যুপথযাত্রীদের সাহায্য করার চেষ্টা করেন। তবে সেই দিনের অভিজ্ঞতা এখনো তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে রাখে। পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেসে ভোগা গনসালেজ বলেন, ঘটনাটি এতটাই ভয়াবহ যে তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে আদামুজ দুর্ঘটনায় পড়া রেনফে ট্রেনের যাত্রী সান্তিয়াগো রোসেন্দোও নতুন দুর্ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মাদ্রিদ থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর হুয়েলভায় একা যাচ্ছিলেন তিনি। দুর্ঘটনার সময় প্রথমে ট্রেনটি হঠাৎ থেমে যায়, এরপর বিকট শব্দে সংঘর্ষ হয়। ট্রেনটি এদিক-ওদিক দুলতে দুলতে একপর্যায়ে কাত হয়ে পড়ে। তখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়।
রোসেন্দো জানান, ট্রেন থেকে বের হওয়ার পর প্রথমেই তিনি একটি মরদেহ দেখতে পান। একই রেলপথে আবারও দুর্ঘটনার খবর তাঁকে বিস্মিত করেছে। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতি ঠেকাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
আদামুজ দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছিল, রেললাইনের একটি অংশ ভেঙে যাওয়ায় একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রেনের পথে চলে যায়। এ ঘটনার পর বিশেষজ্ঞরা রেলপথের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে বরাদ্দ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত স্পেন প্রতিবছর উচ্চগতির রেলপথে গড়ে প্রায় ১৬৭ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। ইউরোপের একই ধরনের রেল নেটওয়ার্ক থাকা দেশগুলোর তুলনায় এ ব্যয় বেশি। তবে মোট বরাদ্দের মাত্র ১৬ শতাংশ ব্যয় হয়েছে রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতে। বাকি অর্থের বড় অংশ গেছে অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নে।
অন্যদিকে ইতালি, জার্মানি ও ফ্রান্স তাদের উচ্চগতির রেলপথের বাজেটের গড়ে ৩৩ থেকে ৩৯ শতাংশ রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করেছে। এসব দেশের রেল নেটওয়ার্ক স্পেনের তুলনায় ছোট হলেও রক্ষণাবেক্ষণে তাদের বরাদ্দের হার বেশি।
স্প্যানিশ অ্যাসোসিয়েশন অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্সের মুখপাত্র হোসে মারিয়া গইকোলেয়া বলেন, রেল নেটওয়ার্কের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও বাড়ানো প্রয়োজন। ১৯৮২ সালে স্পেনে প্রথম উচ্চগতির রেললাইন চালুর সময় নেটওয়ার্কটি ছিল ছোট। বর্তমানে এর বিস্তৃতি ও যাত্রীসংখ্যা দুটোই বেড়েছে। তাই শুধু নতুন লাইন নির্মাণের দিকে নজর না দিয়ে বিদ্যমান অবকাঠামোর যত্ন নেওয়াও জরুরি।
২০২৪ সালে স্পেনের উচ্চগতির ট্রেনে প্রায় চার কোটি যাত্রী ভ্রমণ করেছেন, যা ২০১৯ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এ নেটওয়ার্কে যাত্রীসংখ্যা ছিল প্রায় আড়াই কোটি। তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তা ১৪ শতাংশ কম।
মাদ্রিদ-সেভিয়া রেলপথে চলতি বছরের দুটি দুর্ঘটনার পর সেখানে ব্যবহৃত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। জার্মানির তৈরি এলজেডবি (এলজেডবি) নামের এই ব্যবস্থা ১৯৭০-এর দশকের প্রযুক্তিনির্ভর। স্পেনের উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্কের মধ্যে এই রেলপথেই কেবল ব্যবস্থাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে এটি ধীরে ধীরে বদলে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গইকোলেয়ার মতে, নতুন ব্যবস্থা চালু না হওয়া পর্যন্ত মাদ্রিদ-সেভিয়া রেলপথের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। তাঁর ধারণা, বুধবারের দুর্ঘটনায় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ব্যর্থতার পাশাপাশি মানুষের ভুলও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারীদের।
কাতালোনিয়ার পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও সাবেক শিক্ষক রামিরো আপিন লোপেরা বলেন, ২০১১ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর স্পেনের উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্কের রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অথচ একই সময়ে এই নেটওয়ার্কে যাত্রী ও ট্রেন চলাচল বেড়েছে। তাঁর মতে, রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগ কমিয়ে ব্যবহার বাড়ানোর পরিণতি হিসেবে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
স্পেনের রাষ্ট্রীয় রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রেনফে ছাড়াও দেশটিতে ফ্রান্সের ওউইগো এবং ইতালীয় কনসোর্টিয়ামের অংশ ইরিও বেসরকারি ট্রেন পরিচালনা করে। মাদ্রিদ-সেভিয়া রেলপথের পুরোনো এলজেডবি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
স্পেনের ট্রেনচালকদের ইউনিয়ন সেমাফের প্রতিনিধি দিয়েগো মার্তিন বলেন, দুর্ঘটনার জন্য রেলকর্মীদের দায়ী করলেই ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা বন্ধ হবে না। বরং প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করে তার সমাধান করতে হবে।
পরপর কয়েকটি বড় দুর্ঘটনার পর স্পেনের রেল নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগই এখন দেশটির রেল খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।