- ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বিন্যান্সে বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের তহবিল চুরি হয়েছে। ঘটনাটিকে ক্রিপ্টোকারেন্সির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। হামলার পর গ্রাহকদের অর্থ জমা ও উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিন্যান্স।
বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বিন্যান্স জানায়, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের এক প্রকৌশলীর আপস হওয়া ল্যাপটপে প্রবেশাধিকার পেয়ে হ্যাকাররা অননুমোদিত লেনদেন সম্পন্ন করেছে। তবে কীভাবে হামলাটি ঘটেছে, তা নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এই ঘটনায় গ্রাহকদের কোনো আর্থিক ক্ষতি হলে তার সম্পূর্ণ দায় বিন্যান্স বহন করবে। ব্যবহারকারীদের তহবিল নিরাপদ রয়েছে বলেও আশ্বস্ত করেছে তারা।
আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিন্যান্স বলেছে, সমস্যা নিরাপদে ও পুরোপুরি সমাধানের জন্য তাদের দল দিনরাত কাজ করছে। অপরাধীদের পরিচয় শনাক্ত এবং বিচারের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে ঘটনার প্রযুক্তিগত দিক নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
এর আগে বিন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা ও বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডার চ্যাংপেং ঝাওও এক বার্তায় এক্সচেঞ্জটি হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছে বলে ধারণা প্রকাশ করেন।
ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চমাত্রার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তারা ধারণা করছে, এই সাইবার হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার ইউনিট ‘ট্রেডারট্রেইটার’ জড়িত। তদন্তকারীরা এই গোষ্ঠীকে উত্তর কোরিয়ার কুখ্যাত ‘লাজারাস গ্রুপ’-এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
টিআরএমের বৈশ্বিক নীতিবিষয়ক প্রধান অ্যারি রেডবোর্ড হামলাটিকে নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এত বড় অঙ্কের অর্থ চুরির ঘটনা শুধু ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগজনক।
আল জাজিরাকে রেডবোর্ড বলেন, উত্তর কোরিয়া এ ধরনের বড় অঙ্কের অর্থ চুরি করলে তা অস্ত্র বিস্তারসহ বিভিন্ন অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের ঝুঁকি থাকে। ফলে বিষয়টি কেবল ডিজিটাল মুদ্রা চুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
বিন্যান্সে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েনের দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমে যায়। একপর্যায়ে এর মূল্য ৭৭ হাজার ডলারের নিচে নেমে আসে।
অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিপ্টোবাজার বিশেষজ্ঞ শন ফোলি মনে করেন, বিন্যান্সের মতো বড় প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এতে সামগ্রিকভাবে ক্রিপ্টো সম্পদের বাজারদরেও চাপ তৈরি হতে পারে।
তাঁর মতে, কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত এক্সচেঞ্জে রাখা সম্পদের নিরাপত্তা অনেকটাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে যত বেশি সম্পদ থাকে, সাইবার অপরাধীদের কাছে সেটি তত বড় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
ফোলির ধারণা, এ ঘটনা বিনিয়োগকারীদের বিকেন্দ্রীভূত এক্সচেঞ্জ ব্যবহারের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে পারে। কারণ, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে পরিচালিত এসব প্ল্যাটফর্মকে অনেকে তুলনামূলক বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করেন।
বিন্যান্সে এই হামলার আগে ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল ২০২৫ সালে। সে সময় উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট লাজারাস গ্রুপ ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইবিট থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের সম্পদ চুরি করেছিল। বিন্যান্সের ঘটনায় চুরির অঙ্ক সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।
টিআরএমের ২০২৬ সালের ক্রিপ্টো ক্রাইম রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ১৫০টি পৃথক হ্যাকিংয়ের ঘটনায় সাইবার অপরাধীরা মোট ২৮৭ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরি করে।
২০১৭ সালে চীনে চ্যাংপেং ঝাওয়ের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় বিন্যান্স। কয়েনমার্কেটক্যাপের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনাধীন সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। বিশ্বের অন্য যেকোনো ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের তুলনায় এ পরিমাণ বেশি।
বিন্যান্সের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে এমন হামলার ঘটনা ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারের নিরাপত্তা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং ডিজিটাল সম্পদ সংরক্ষণের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তদন্তের ফলাফল এবং চুরি হওয়া সম্পদের কতটা উদ্ধার করা সম্ভব হয়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।