- ৩০ জুলাই, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
গাজায় দীর্ঘ যুদ্ধ ও অব্যাহত অবরোধের প্রভাবে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি, হাসপাতাল ধ্বংস এবং চিকিৎসাকেন্দ্রের সীমিত সক্ষমতার কারণে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে যুদ্ধাহত হাজারো মানুষ কৃত্রিম অঙ্গ, হুইলচেয়ার ও পুনর্বাসনসেবার অভাবে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সোডিয়াম বাইকার্বোনেটের সংকটে উপত্যকাটির প্রায় অর্ধেক ডায়ালাইসিস মেশিন অচল হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের আগে কিডনি রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া সাতটি হাসপাতাল থাকলেও বর্তমানে মাত্র চারটি হাসপাতালে এ সেবা চালু রয়েছে।
যুদ্ধের আগে গাজায় প্রায় ১ হাজার ২০০ কিডনি রোগী নিয়মিত চিকিৎসা নিতেন। এখন সেই সংখ্যা কমে প্রায় ৭০০-তে নেমে এসেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ডায়ালাইসিস সেবা ব্যাহত হওয়া এবং জরুরি ওষুধের অভাবে চার শতাধিক রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
গাজা নগরীর আল-শিফা হাসপাতালের ডায়ালাইসিস ইউনিটে প্রতিদিন জীবন বাঁচাতে লড়াই করছেন অসংখ্য রোগী। তাদেরই একজন উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকার ১৪ বছর বয়সী রুয়া মুনতাসির আবদুল করিম। নিয়মিত ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল এই কিশোরীর চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় উদ্বেগে দিন কাটছে পরিবারের।
রুয়ার বাবা মুনতাসির বলেন, অসুস্থ হওয়ার আগে মেয়েটি স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা ও খেলাধুলা করত। অস্ত্রোপচার ও ডায়ালাইসিসের পর তার জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। প্রতিটি ডায়ালাইসিস সেশন তার বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসায় সামান্য বিরতিও তাকে তীব্র দুর্বলতা ও শ্বাসকষ্টে ফেলতে পারে।
চিকিৎসার অভাবে রুয়ার শারীরিক অবস্থারও অবনতি হয়েছে। একসময় তার ওজন ছিল প্রায় ৬৫ কেজি, যা কমে ৩৫ কেজিতে নেমেছে। আগে সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস নেওয়ার সুযোগ পেলেও এখন তা কমে দুইবারে দাঁড়িয়েছে।
রুয়ার জন্য কিডনি প্রতিস্থাপনের সব প্রস্তুতি থাকলেও গাজার বাইরে চিকিৎসার অনুমতি না পাওয়ায় তা আটকে আছে। তার মা কিডনি দিতে প্রস্তুত এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষাতেও মিল পাওয়া গেছে। কিন্তু চিকিৎসার জন্য গাজা ছাড়ার আবেদন ছয় মাস ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
মধ্য গাজার আল-আকসা হাসপাতালের কিডনি বিভাগের প্রধান ওসামা আবু রাহমা জানান, হাসপাতালে থাকা ৫১টি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে ২৫টিই সম্পূর্ণ অচল। ফলে প্রায় ২৪০ রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে তীব্র চাপের মুখে পড়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সীমিত সক্ষমতার কারণে রোগীদের ডায়ালাইসিসের সংখ্যা ও প্রতিটি সেশনের সময় কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে হাসপাতাল। এর ফলে রোগীদের মধ্যে দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের জটিলতা এবং রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় পটাশিয়াম বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
শুধু কিডনি রোগী নয়, যুদ্ধাহত ও অঙ্গহানির শিকার মানুষের অবস্থাও ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, যুদ্ধে গাজায় ৪৩ হাজারের বেশি মানুষ এমন ধরনের আঘাত পেয়েছেন, যা তাদের জীবনকে স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছে। তাদের মধ্যে হাজারো মানুষের অঙ্গচ্ছেদ হয়েছে বা স্থায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে ফিজিওথেরাপিস্ট আয়া আল-শালতুনি বলেন, কৃত্রিম অঙ্গ, হুইলচেয়ার ও ক্রাচের চাহিদা ব্যাপক হলেও সরবরাহ অত্যন্ত সীমিত। অনেক রোগী দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণ পাচ্ছেন না।
যুদ্ধের কারণে গাজার পুনর্বাসনকেন্দ্রগুলোও সীমিত জনবল ও সরঞ্জাম নিয়ে কাজ করছে। ফলে চিকিৎসার প্রাথমিক ধাপ শেষ হলেও বহু রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন না।
এদিকে যুদ্ধের প্রভাব শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দীর্ঘদিনের হামলা, বাস্তুচ্যুতি, স্বজন হারানো এবং ঘরবাড়ি ধ্বংসের ঘটনায় গাজাজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য সংকটও তীব্র হয়ে উঠেছে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, গাজার মানুষের মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ, অনিদ্রা, আতঙ্ক এবং যুদ্ধজনিত মানসিক আঘাতের লক্ষণ ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। শিশুদের মধ্যেও দুঃস্বপ্ন, আচরণগত পরিবর্তন, মনোযোগের ঘাটতি এবং অভিভাবকদের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার মতো সমস্যা বাড়ছে।
তবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাও সংকটের বাইরে নয়। নিরাপত্তাহীনতা, প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব, রোগীর অতিরিক্ত চাপ এবং বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছানোর জটিলতার কারণে মনোসামাজিক সহায়তা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মীরা।
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় প্রতিদিনই চিকিৎসার প্রয়োজন বাড়ছে, কিন্তু সেই তুলনায় কমছে হাসপাতালের সক্ষমতা ও চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ। ফলে ডায়ালাইসিস রোগী, যুদ্ধাহত মানুষ এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অসংখ্য বাসিন্দার জন্য স্বাস্থ্যসেবা এখন বেঁচে থাকার আরেকটি কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।