- ২৯ জুলাই, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
তাইওয়ানের পূর্ব উপকূলের জলসীমায় চীনের কোস্টগার্ড ও বেসামরিক জাহাজের উপস্থিতি বাড়ছে। এ ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে, বেইজিং হয়তো স্বশাসিত তাইওয়ানকে বাইরের বাণিজ্য ও সহায়তা থেকে বিচ্ছিন্ন করার কৌশল অনুশীলন করছে।
চীনের সরকারি ঘোষণার তথ্য অনুযায়ী, জুন ও জুলাই মাসে দেশটির মেরিটাইম সেফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং কোস্টগার্ড তাইওয়ানের আশপাশের জলসীমায় একাধিক টহল ও বিশেষ সামুদ্রিক আইন প্রয়োগ অভিযান পরিচালনা করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন সাধারণত তাইওয়ান প্রণালিতে নিয়মিত টহল চালালেও এবার অল্প সময়ের ব্যবধানে তাইওয়ানের পূর্ব দিকের জলসীমায় এ ধরনের তৎপরতা নজিরবিহীন। তাদের ধারণা, এর মাধ্যমে বেইজিং তাইওয়ানকে ঘিরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি আরও স্পষ্ট করার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ন্যাশনাল ব্যুরো অব এশিয়ান রিসার্চের গবেষক কে ট্রিস্টান ট্যাং বলেন, চীনের এই পদক্ষেপ তাইওয়ানের জন্য কৌশলগত ও প্রতীকী—দুই ধরনের বার্তা বহন করছে। তার মতে, বেইজিং শুধু তাইওয়ান প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি নয়, বরং দ্বীপটির পূর্বাঞ্চলীয় জলসীমাতেও নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে।
তাইওয়ান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চীনের তথাকথিত ‘আইন প্রয়োগ অভিযান’-এর অংশ হিসেবে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর উৎস ও গন্তব্য সম্পর্কে তথ্য চাওয়া হচ্ছে।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে তাইওয়ানের আশপাশে চীনের কোস্টগার্ড ও গবেষণা জাহাজের ৫৫টি উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। মে মাসে এই সংখ্যা ছিল ৩০টি। চীনের জাহাজগুলো তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রিত কিন্তু জনবসতিহীন ডংশা দ্বীপপুঞ্জের কাছেও তৎপরতা চালিয়েছে।
চীন দাবি করছে, জাপান ও ফিলিপাইনের সামুদ্রিক সীমা নিয়ে আলোচনার প্রতিক্রিয়ায় এসব অভিযান চালানো হচ্ছে। বেইজিংয়ের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ড চীনের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব ও সামুদ্রিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
চীন তাইওয়ানকে নিজেদের একটি প্রদেশ হিসেবে দাবি করে আসছে। একই সঙ্গে তাইওয়ানের অর্থনৈতিক জলসীমার ওপরও নিজেদের অধিকার রয়েছে বলে দাবি করে দেশটি। তবে তাইওয়ান ও বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পক্ষ এই অবস্থানের বিরোধিতা করে আসছে।
বিশ্লেষকদের অনেকে চীনের সাম্প্রতিক তৎপরতাকে ‘গ্রে জোন’ কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন। এই কৌশলে সরাসরি যুদ্ধ শুরু না করেও প্রতিপক্ষের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করা হয়।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র নিরাপত্তা প্রকল্প ‘সি লাইট’-এর পরিচালক রে পাওয়েল বলেন, চীন ধীরে ধীরে তাইওয়ানের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। তার মতে, এসব অভিযান ভবিষ্যতে অবরোধ বা জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের মতো বড় পদক্ষেপে রূপ নিতে পারে।
তাইওয়ান একটি দ্বীপ রাষ্ট্র হওয়ায় জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো অবরোধের পরিস্থিতি তৈরি হলে দেশটি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থার বিশেষজ্ঞ চাওলুয়েন লিন বলেন, চীনের কোস্টগার্ডকে শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এটি দেশটির সামরিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে নৌবাহিনীর বিকল্প শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
চীনের সাম্প্রতিক সামুদ্রিক তৎপরতা নিয়ে যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জুনের শেষ দিকে এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও চীনের বর্ধিত টহল কার্যক্রমের সমালোচনা করে বলেছেন, এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ব্যস্ত থাকায় চীন তাইওয়ান ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ নিচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেন, ওয়াশিংটন বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। ফলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের সামুদ্রিক কার্যক্রমের দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা কিছুটা সীমিত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও দ্বীপটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে আসছে। তবে ভবিষ্যতে চীন-তাইওয়ান উত্তেজনায় ওয়াশিংটনের ভূমিকা কতটা সক্রিয় থাকবে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
চীনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ তাইওয়ান ঘিরে দীর্ঘদিনের উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সরাসরি সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ ও চাপ প্রয়োগের কৌশলই এখন বেইজিংয়ের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।