- ২৯ জুলাই, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে দীর্ঘদিন ধরে নিজের রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম বড় ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে আসছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তবে ইরান যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলবিরোধী সমালোচনা বাড়তে থাকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে যাচ্ছেন নেতানিয়াহু। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এটি দুই নেতার প্রথম বৈঠক। ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচন, দুর্নীতির মামলাসহ দেশের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নানা চাপের মধ্যে এই সফর নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তরুণ বয়সের একটি বড় সময় যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়েছেন নেতানিয়াহু। মার্কিন রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রাখার কৃতিত্বও দাবি করে আসছেন তিনি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর দুই নেতার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের পর ট্রাম্পকে নেতানিয়াহুর অন্যতম শক্তিশালী আন্তর্জাতিক মিত্র হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
তবে ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া, ইসরায়েলের মতামত ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে ওয়াশিংটনের আলোচনা এবং যুক্তরাষ্ট্রে নেতানিয়াহুর সমালোচনা বাড়ার কারণে সেই সম্পর্কের উষ্ণতা কমেছে বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
নেতানিয়াহুর ওয়াশিংটন সফরের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও নিউইয়র্কে দেশটির সাবেক কনসাল জেনারেল অ্যালন পিংকাস। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, সফরের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচিতে ইরান, তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি এবং সৌদি আরবের সম্ভাব্য পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির মতো বিষয় থাকলেও সফরের পেছনে রাজনৈতিক হিসাবও রয়েছে।
তাঁর মতে, ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখনো অটুট রয়েছে—ইসরায়েলের জনগণ ও রাজনৈতিক মহলে এমন বার্তা দিতে চাইতে পারেন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে দুর্নীতির মামলায় ট্রাম্প আবারও তাঁর পক্ষে অবস্থান নেবেন, এমন প্রত্যাশাও থাকতে পারে।
নেতানিয়াহু অবশ্য এমন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন, যখন দেশটিতে তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা আগের তুলনায় দুর্বল বলে মনে করছেন কিছু বিশ্লেষক। মার্কিন ডানপন্থী রাজনীতির কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বও সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর সমালোচনা করেছেন।
ইসরায়েলের বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীগুলোর সহিংস কর্মকাণ্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাবনা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন মতপার্থক্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সোমবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তুরস্কের কাছে যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে ইসরায়েলের আপত্তির প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কী বিক্রি করবে, তা অন্য কেউ ঠিক করে দেবে না।
ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং কিংস কলেজ লন্ডনের যুদ্ধবিষয়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অ্যাহরন ব্রেগম্যানের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের আশপাশের অনেক ব্যক্তিই এখন নেতানিয়াহুকে সন্দেহের চোখে দেখছেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, নেতানিয়াহুই ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে একটি এমন যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন, যা পরে কৌশলগত সংকটে পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু আর আগের মতো ওয়াশিংটনে নিজের প্রভাব সহজে তুলে ধরতে পারবেন না।
তবে প্রকাশ্যে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে বড় ধরনের মতবিরোধ দেখা যাবে বলে খুব কম বিশ্লেষকই মনে করছেন। বৈঠকে দুই নেতার মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ ও পারস্পরিক প্রশংসা থাকতে পারে। তবে পর্দার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহুর বিভিন্ন নীতি নিয়ে কঠোর অবস্থান নিতে পারেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরায়েলি জনমত বিশ্লেষক এবং নব্বইয়ের দশকে নেতানিয়াহুর সহযোগী হিসেবে কাজ করা মিচেল বারাক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনায় নেতানিয়াহুর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকলেও তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন।
বারাকের মতে, ট্রাম্প হয়তো নেতানিয়াহুকে যুদ্ধকালীন একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে প্রশংসা করতে পারেন। তবে ভবিষ্যতে ইসরায়েলে নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে—এমন বার্তাও দিতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ইসরায়েলে অক্টোবরের শেষ দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তাই ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের রাজনৈতিক প্রভাব নেতানিয়াহুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ককে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনৈতিক সুবিধা তিনি পেয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা আগের মতো কার্যকর থাকবে কি না—সেই প্রশ্ন এখন আরও জোরালো হয়ে উঠছে।