Saturday, August 1, 2026

একরামুল হত্যাকাণ্ডে নতুন মোড়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ


ছবিঃ (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। টেকনাফ 

২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে মোবাইল ফোনের ওপাশে বাবার কণ্ঠ শুনে এমন প্রশ্ন করেছিল টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হকের বড় মেয়ে তাহিয়া হক। কিন্তু মেয়ের সেই প্রশ্নের আর কোনো উত্তর দেননি বাবা। কিছুক্ষণ পর ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে গুলির শব্দ। এরপর থেমে যায় একরামুল হকের কণ্ঠ।

সেই ফোনালাপের অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। তবে পরিবারের অভিযোগ, স্বজন হারানোর শোক প্রকাশের সুযোগও তখন তারা পাননি। উল্টো চাপ, ভয় ও নজরদারির মধ্যে টেকনাফ ছেড়ে চট্টগ্রামে গিয়ে বসবাস করতে হয়েছে তাদের।

দীর্ঘ আট বছর পর একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিচারের আশা দেখছে পরিবারটি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার।

টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের টানা তিনবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর ছিলেন একরামুল হক। তিনি স্থানীয় যুবলীগের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

পরিবারের দাবি, তৎকালীন মাদকবিরোধী অভিযানের সময় পরিকল্পিতভাবে একরামুল হককে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মাদকচক্রকে আড়াল করতে একই নামের অন্য এক ব্যক্তির পরিচয় ও অভিযোগ একরামুল হকের সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে তাকে ‘ইয়াবার গডফাদার’ হিসেবে প্রচার করে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয় বলে দাবি পরিবারের। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

হত্যাকাণ্ডের রাতে বাবার ফেরার অপেক্ষায় ছিল তাহিয়া ও তার ছোট বোন নাহিয়ান। তখন তাহিয়া টেকনাফ ৮ বিজিবি স্কুলের অষ্টম শ্রেণির এবং নাহিয়ান ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

রাত গভীর হলেও বাবা বাড়ি না ফেরায় তাহিয়া তাকে ফোন দেয়। ফোন ধরার পর বাবার কণ্ঠে আতঙ্ক ও অসহায়ত্ব বুঝতে পেরে সে প্রশ্ন করে, ‘আব্বু, তুমি কান্না করতেছ যে?’

পরিবারের ভাষ্য, মেয়ের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই ফোনের অপর প্রান্তে গুলির শব্দ শোনা যায়। এরপর আর বাবার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

একটি ফোনালাপের মধ্য দিয়ে পরিবারের স্বাভাবিক জীবন বদলে যায়। একরামুল হকের স্ত্রী আয়েশা বেগমের অভিযোগ, অডিওটি প্রকাশের পর ঘটনাটি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হলেও তাদের পরিবারকে নীরব থাকতে চাপ দেওয়া হয়।

পরিবারের দাবি, ঘটনার পর টেকনাফে থাকা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। নিরাপত্তার শঙ্কায় তারা ভিটেমাটি ছেড়ে চট্টগ্রামে চলে যান। সেখানেও দীর্ঘদিন নজরদারির মধ্যে থাকতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন আয়েশা বেগম।

তার ভাষ্য, বাড়ির আশপাশে অচেনা লোকজনের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। সন্তানদের স্কুলে নেওয়ার সময় মোটরসাইকেলে অনুসরণ করা হতো। বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিষয়টি নিয়ে আর এগোতে নিষেধ করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

আয়েশা বেগম বলেন, ঘটনার পর তারা টেকনাফ থানায় মামলা করতে চাইলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। পরে আদালতের আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করলেও অনেক আইনজীবী মামলাটি পরিচালনায় অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, তৎকালীন সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ফোন করে সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনের সামনে কথা না বলতে এবং প্রকাশ্যে কান্নাকাটি না করতে বলেছিলেন। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

আয়েশা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী কোনো ইয়াবা ব্যবসায়ী ছিলেন না। পরিকল্পিতভাবে তাকে অপরাধী হিসেবে তুলে ধরে হত্যা করা হয়েছে। যারা আমার পরিবারকে ধ্বংস করেছে, আমি তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেখে যেতে চাই।’

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একরামুল হক হত্যার ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় আসে। দীর্ঘদিনের অডিও রেকর্ড, পরিবারকে টেকনাফ থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিভিন্ন তথ্য এবং স্বজনদের বক্তব্য এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অভিযোগের অংশ হয়েছে।

দীর্ঘ আট বছর ধরে বিচারপ্রাপ্তির অপেক্ষায় থাকা আয়েশা বেগম ও তার দুই মেয়ে এখন আদালতের প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন। তাদের প্রত্যাশা, বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা সেই রাতের ঘটনার সত্য সামনে আসবে এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন