- ০৩ আগস্ট, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এজেন্টের দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে অনেকে ধারণা করেছিলেন, ভবিষ্যতে প্রচলিত মোবাইল অ্যাপের প্রয়োজন কমে যেতে পারে। তবে সাম্প্রতিক চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। নতুন উদ্ভাবন, সৃজনশীল ধারণা এবং সহজে সফটওয়্যার তৈরির সুযোগ বাড়ায় অ্যাপ স্টোরে আবারও দেখা যাচ্ছে নতুন উদ্যোগের জোয়ার।
বিশেষ করে এআই-সহায়তায় কোড লেখার প্রযুক্তি জনপ্রিয় হওয়ার পর কম সময় ও কম প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিয়েও নতুন অ্যাপ তৈরি ও প্রকাশ করা সহজ হয়েছে। এতে অভিজ্ঞ ডেভেলপারদের পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিতে আগ্রহীরাও অ্যাপ তৈরির সুযোগ পাচ্ছেন।
একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে অ্যাপল অ্যাপ স্টোর ও গুগল প্লে—দুই প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে নতুন অ্যাপ প্রকাশের সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। শুধু অ্যাপলের আইওএস অ্যাপ স্টোরেই নতুন অ্যাপের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ।
তবে দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে তৈরি হওয়া ‘ভাইব-কোডেড’ অ্যাপের কারণে অ্যাপ স্টোরে নিম্নমানের সফটওয়্যারের সংখ্যা বাড়তে পারে—এমন উদ্বেগও রয়েছে। তারপরও ব্যবহারকারীর প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম এবং ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা দেওয়া অ্যাপগুলো দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
নতুন প্রজন্মের অনেক অ্যাপ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করলেও নিজেদের ‘এআই অ্যাপ’ হিসেবে প্রচার করছে না। বরং ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন কাজ সহজ করা, তথ্য গুছিয়ে রাখা কিংবা নতুন ধরনের সামাজিক যোগাযোগের অভিজ্ঞতা দেওয়াকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের নজরে আসা কয়েকটি অ্যাপ ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা পছন্দের ভিডিও, ভ্রমণের পরিকল্পনা, রেসিপি বা অন্য কোনো তথ্য পরে দেখার জন্য সংরক্ষণ করলেও অনেক সময় সেগুলো খুঁজে পাওয়া যায় না। এ সমস্যার সমাধান দিতে তৈরি হয়েছে ‘অ্যালবো’ নামের অ্যাপ।
টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের লিংক অ্যাপে পাঠালে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ, শ্রেণিবিন্যাস ও সংরক্ষণ করে। মূল পোস্ট বা ভিডিও পরে মুছে গেলেও সংরক্ষিত তথ্য অ্যাপে রাখা সম্ভব বলে দাবি নির্মাতাদের।
অ্যালবো পিন্টারেস্ট, এক্স, লিংকডইন, থ্রেডস, রেডিট ও ফেসবুকের পাশাপাশি ক্রোম ও সাফারি ব্রাউজারের সঙ্গেও ব্যবহার করা যায়। ব্যবহারকারীরা স্ক্রিনশটও যুক্ত করতে পারেন এবং তৈরি করা সংগ্রহ বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন।
লন্ডনভিত্তিক অ্যাপ স্টুডিও ‘দ্য ফিল গুড প্রজেক্ট’ অ্যাপটি তৈরি করেছে। এর মৌলিক সংস্করণ বিনা মূল্যে ব্যবহার করা গেলেও কিছু বাড়তি সুবিধার জন্য সাবস্ক্রিপশন প্রয়োজন।
স্থানীয় কৃষক, বাগানপ্রেমী, ঘরোয়া খাদ্য প্রস্তুতকারী ও কারুশিল্পীদের সঙ্গে আশপাশের ক্রেতাদের যুক্ত করতে তৈরি হয়েছে ‘কুপ’ অ্যাপ।
অ্যাপটির মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা কাছাকাছি থাকা বিক্রেতাদের খুঁজে বের করতে, পছন্দের বিক্রেতাকে অনুসরণ করতে এবং তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ঘরে তৈরি বা স্থানীয় পণ্য কিনতে পারেন। বিক্রেতারা অর্ডার পাওয়ার পর পণ্য প্রস্তুত করে ক্রেতার কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করেন।
অ্যাপটির লক্ষ্য স্থানীয় অর্থনীতি ও ছোট উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা এবং ব্যক্তিগত বাগান, খামার বা কারুশিল্পকে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগে পরিণত করা।
‘পিআই.এফওয়াইআই’ নামের আরেকটি অ্যাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচলিত অ্যালগরিদমভিত্তিক অভিজ্ঞতার বিকল্প হিসেবে তৈরি হয়েছে।
এখানে ব্যবহারকারীরা নিজেদের পছন্দ ও আগ্রহের বিষয়গুলো সংরক্ষণ ও অন্যদের সঙ্গে ভাগ করতে পারেন। সংগীত, সাহিত্য, রেট্রো সংস্কৃতি ও বিভিন্ন সৃজনশীল আগ্রহভিত্তিক বিভাগে নতুন মানুষ ও কনটেন্ট খুঁজে পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অ্যাপটিতে বিভিন্ন নিবন্ধ পড়া, তালিকা তৈরি, স্থানীয় সুপারিশ সংগ্রহ এবং বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলার সুবিধাও রয়েছে।
চিঠি লেখার পুরোনো অভিজ্ঞতাকে ডিজিটাল মাধ্যমে ফিরিয়ে আনতে তৈরি হয়েছে ‘লেত্র’ অ্যাপ। এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে পেনফ্রেন্ড হিসেবে যোগাযোগ শুরু করা যায়।
অ্যাপের মাধ্যমে কিংবা ই-মেইলে ডিজিটাল চিঠি পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে ডাকযোগে চিঠি পাঠানোর সুবিধা যুক্ত করার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।
সিনেমা ও টেলিভিশন সিরিজ দেখার তালিকা গুছিয়ে রাখতে সহায়তা করে ‘সোফা টাইম’। ব্যবহারকারীরা কোন সিনেমা বা সিরিজ দেখছেন, ভবিষ্যতে কী দেখতে চান এবং নতুন কোনো কনটেন্ট প্রকাশিত হলে কখন তা দেখা যাবে—এসব তথ্য অ্যাপটিতে সংরক্ষণ করতে পারেন।
এতে ছবি বা জিআইএফ ব্যবহার করে প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষার ব্যবহারকারীদের জন্য অনুবাদ সুবিধাও যুক্ত করা হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নেভারের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের তৈরি ‘থিংসবুক’ মূলত লেখা ও ব্যক্তিগত আগ্রহ সংরক্ষণের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।
এখানে ব্যবহারকারীরা ডায়েরি লেখা, নতুন ধারণা সংরক্ষণ এবং বই, ভ্রমণ, খাবার, শখ ও ব্যক্তিগত লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন তালিকা তৈরি করতে পারেন।
নির্মাতাদের ভাষ্য, ক্ষণস্থায়ী অনলাইন প্রবণতার পেছনে না ছুটে মানুষের আগ্রহ, পছন্দ ও অভিজ্ঞতার দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল নথি তৈরি করাই অ্যাপটির লক্ষ্য।
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য তৈরি ‘প্রেসড পেটালস’ অ্যাপ ফুলের ছবিকে পুরোনো উদ্ভিদবিষয়ক বইয়ের সংরক্ষিত নমুনার মতো ডিজিটাল রূপ দেয়।
ব্যবহারকারী কোনো ফুলের ছবি তুললে অ্যাপটি সেটিকে ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করার পাশাপাশি ফুলটির নাম শনাক্ত করে। একই সঙ্গে ফুলটি কোথায়, কোন তারিখে এবং কখন দেখা হয়েছে—সেসব তথ্যও সংরক্ষণ করা যায়।
প্রথম দুটি ফুল বিনা মূল্যে সংরক্ষণের সুযোগ থাকলেও পুরো সুবিধা ব্যবহারের জন্য একবারের ফি দিতে হয়।
‘মুডস ফাস্টার’ নামের একটি অ্যাপ দ্রুত মনের অবস্থা বা অনুভূতির তথ্য সংরক্ষণের সুবিধা দেয়। ব্যবহারকারী প্রথমে নিজের বর্তমান অনুভূতি নির্বাচন করবেন, এরপর একটি স্পর্শে তা সংরক্ষণ করা যাবে।
অ্যাপটি অ্যাপল হেলথের সঙ্গে তথ্য যুক্ত করতে পারে। ব্যবহারকারীরা চাইলে অনুভূতির পেছনের পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট আবেগের তথ্যও যুক্ত করতে পারেন।
পরিবারের সদস্যদের শারীরিকভাবে সক্রিয় রাখতে তৈরি ‘অ্যাকটিভেট ফিটনেস’ অ্যাপটি প্রথমে শিশুদের ব্যায়ামে উৎসাহিত করার লক্ষ্য নিয়ে চালু হয়েছিল। পরে এর ব্যবহার পুরো পরিবারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
অ্যাপটির মাধ্যমে নির্দিষ্ট শারীরিক লক্ষ্য পূরণের সঙ্গে স্ক্রিন ব্যবহারের সময় যুক্ত করা যায়। যেমন—দিনের নির্ধারিত সংখ্যক পদক্ষেপ সম্পন্ন না করা পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার না করার ব্যক্তিগত নিয়ম তৈরি করা সম্ভব।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এআই এজেন্টের ব্যবহার বাড়লেও মোবাইল অ্যাপের প্রয়োজন কমছে না। বরং এআই-সহায়তায় সফটওয়্যার তৈরির গতি বাড়ায় নতুন ধারণার অ্যাপ বাজারে আসছে আরও দ্রুত।
তাদের মতে, ভবিষ্যতের অ্যাপগুলো শুধু এআই-নির্ভর পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন সমস্যা সহজভাবে সমাধান করা, ব্যক্তিগত আগ্রহকে গুছিয়ে রাখা এবং নতুন ধরনের ডিজিটাল অভিজ্ঞতা তৈরি করাই হবে তাদের প্রধান শক্তি।