- ২৪ জুলাই, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো গত কয়েক মাসে তাদের উন্নত মডেলগুলোর ওপর কঠোর নিরাপত্তা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতা এখন উল্টো বৈধ সাইবার নিরাপত্তা গবেষক এবং নেটওয়ার্ক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের কাজকে জটিল করে তুলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, অপরাধীদের ঠেকাতে তৈরি করা ‘গার্ডরেল’ বা নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এমনভাবে কাজ করছে যে, প্রকৃত গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন না। ফলে নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত ও প্রতিরোধের কাজ আগের তুলনায় আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে অ্যানথ্রপিকের বহুল আলোচিত দুটি এআই মডেলের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। অভিযোগ ছিল, নির্দিষ্ট কৌশল ব্যবহার করে ওই মডেলগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এড়িয়ে সাইবার হামলার কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। পরে অবশ্য একটি মডেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় এবং আরেকটি শুধুমাত্র যাচাইকৃত মার্কিন প্রতিষ্ঠানের জন্য সীমিতভাবে উন্মুক্ত করা হয়।
অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআই উভয় প্রতিষ্ঠানই সাইবার নিরাপত্তা গবেষকদের জন্য বিশেষ যাচাইকরণ কর্মসূচি চালু করেছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে অনুমোদিত গবেষকেরা তুলনামূলক কম সীমাবদ্ধতার মধ্যে এআই মডেল ব্যবহার করতে পারেন। তবে গবেষকদের অনেকেই মনে করেন, এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত সীমিত এবং প্রয়োজনের তুলনায় ধীর।
বিশ্বখ্যাত নিরাপত্তা গবেষক মার্ক ডাউড সম্প্রতি এক পডকাস্টে বলেন, কোন গবেষণা নিরাপদ আর কোনটি নয় এ সিদ্ধান্ত বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একতরফাভাবে নেওয়া স্বস্তিদায়ক নয়। তার মতে, নিরাপত্তা গবেষণার বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল এবং সব ক্ষেত্রে একই ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকর করা উচিত নয়।
নিরাপত্তা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনসিসি গ্রুপের প্রধান বিজ্ঞানী ক্রিস অ্যানলি বলেন, কোনো সফটওয়্যারের দুর্বলতা সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ কি না, তা যাচাই করতে অনেক সময় এআইয়ের সহায়তায় সম্ভাব্য আক্রমণের ধরন বিশ্লেষণ করতে হয়। কিন্তু গার্ডরেল সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়।
তার ভাষায়, একই প্রযুক্তি যেমন সাইবার হামলায় ব্যবহার করা যেতে পারে, তেমনি সেটিই আবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতেও অপরিহার্য। তিনি একটি হাতুড়ির সঙ্গে তুলনা করে বলেন, একটি হাতুড়ি দিয়ে যেমন বাড়ি তৈরি করা যায়, তেমনি সেটি অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। তাই শুধু সম্ভাব্য অপব্যবহারের আশঙ্কায় পুরো প্রযুক্তিকে সীমাবদ্ধ করে রাখার যৌক্তিকতা নেই।
এ ধরনের সমস্যার কারণে অনেক গবেষক শেষ পর্যন্ত উন্মুক্ত উৎসভিত্তিক (ওপেন সোর্স) এআই মডেলের দিকে ঝুঁকছেন। এসব মডেলে কোনো ধরনের ব্যবহারগত বিধিনিষেধ নেই এবং স্থানীয় কম্পিউটারেই চালানো যায়। ফলে সংবেদনশীল তথ্য ক্লাউডে পাঠানোর ঝুঁকিও থাকে না।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্রাউডফেন্সের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা পাওলো স্তানিয়ো বলেন, অনেক সময় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষকদের এমনভাবে বিবেচনা করে যেন তারা নিজেরাই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নন। তার মতে, নিরাপত্তা গবেষণার মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কার্যকর সমাধান নয়।
অন্যদিকে নিরাপত্তা গবেষক জিউসেপ্পে কালি জানান, তিনি এআই ব্যবহার করেন মূলত সফটওয়্যারের কাঠামো বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক টুল তৈরির কাজে। তবে দুর্বলতা খুঁজে বের করা এবং সেটিকে কাজে লাগানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশ তিনি নিজেই করতে পছন্দ করেন। তার ভাষায়, গবেষণার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অংশটি এখনো মানুষের হাতেই থাকা উচিত।
শিল্পখাতের আরেকজন গবেষক, যিনি পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি, বলেন, তার প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের বিশেষ যাচাইকরণ কর্মসূচির বাইরে থাকায় নিরাপত্তা গবেষণার ক্ষেত্রে এআই মডেলগুলো প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কোনো প্রশ্ন করলেই মডেল উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
অফেনসিভ এআই কনফারেন্সের প্রতিষ্ঠাতা ও রিমোটথ্রেটের প্রধান নির্বাহী ক্রিস থম্পসনের মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো গার্ডরেলের অসঙ্গতি। একই ধরনের প্রশ্নে একদিন যে উত্তর পাওয়া যায়, পরদিন সেটি নাও মিলতে পারে। এতে গবেষকদের মূল্যবান সময় নিরাপত্তা বিশ্লেষণের পরিবর্তে এআইয়ের সঙ্গে ‘আলোচনা’ করতেই ব্যয় হয়।
তার দাবি, এই পরিস্থিতির কারণে অনেক দায়িত্বশীল গবেষক যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাণিজ্যিক এআই প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বিদেশি ওপেন সোর্স মডেলের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব দুই ক্ষেত্রেই নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সাইবার হামলার সংখ্যা ও জটিলতা আরও বাড়বে। তাই অপব্যবহার রোধের পাশাপাশি বৈধ গবেষক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের জন্য দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ ও কার্যকর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায়, সাইবার প্রতিরক্ষায় কাজ করা ব্যক্তিরাই প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন।