- ১৭ জুন, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
কর ও ভ্যাট সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি মামলা এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে থাকার সমস্যার সমাধানে বড় ধরনের সংস্কারের পথে হাঁটছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আয়কর ও ভ্যাট আপিলের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক জমার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ব্যবসায়ী মহলে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন আপিল ফোরামে ৩৩ হাজারের বেশি কর মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে, যা ব্যবসা ও বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
প্রস্তাবিত পরিবর্তন অনুযায়ী, আয়কর বিরোধে কমিশনার (আপিল) থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত আপিলের ক্ষেত্রে মোট জমার হার ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৪ শতাংশ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভ্যাট ও শুল্ক সংক্রান্ত বিরোধে জমার হার ২০ থেকে ৩০ শতাংশের পরিবর্তে মাত্র ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো করদাতাদের জন্য ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার সহজ করা এবং অযৌক্তিক আর্থিক চাপ কমানো। একই সঙ্গে কর প্রশাসনকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করে তোলার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ জমার বাধ্যবাধকতা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করেছিল। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিপুল অর্থ আটকে থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ কিংবা উৎপাদন কার্যক্রমে সেই অর্থ ব্যবহার করতে পারত না।
বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, নতুন নীতির ফলে কোম্পানিগুলোর নগদ অর্থপ্রবাহ বাড়বে এবং কর সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির আইনি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা সহজ হবে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশের কর ব্যবস্থা আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
তবে কর বিশেষজ্ঞরা এ সংস্কারকে স্বাগত জানালেও কিছু সতর্কতার কথাও উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, জমার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় কিছু করদাতা মামলাকে দীর্ঘায়িত করার প্রবণতা দেখাতে পারেন। তাই আপিল প্রক্রিয়া দ্রুত নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে অনেক কর ও ভ্যাট মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে পৌঁছাতে সাত থেকে পনেরো বছর পর্যন্ত সময় লাগছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, জমার হার কমানোর পাশাপাশি দ্রুত ও দক্ষ বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে সংস্কারের প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে।
আপিল ব্যবস্থার সংস্কারের পাশাপাশি কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তরেও জোর দেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছর থেকে ইলেকট্রনিক ভ্যাট রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজতর অনলাইন রিটার্ন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তব্যে বলেন, করদাতাদের জন্য প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য। তার মতে, কর বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যয় ও সময় কমানো গেলে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রস্তাবিত সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের কর প্রশাসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য আরও সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।