- ০৬ আগস্ট, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
দেশের স্বর্ণ খাতকে আরও স্বচ্ছ, আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনতে বিদ্যমান নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বৈধ স্বর্ণ আমদানি বৃদ্ধি, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং স্বর্ণালংকার রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারণকে সামনে রেখে ‘স্বর্ণ নীতিমালা-২০১৮ (সংশোধিত)-২০২৬’ চূড়ান্ত করার কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক পর্যালোচনা সভায় সংশোধিত নীতিমালার খসড়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা এবং খাতসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিত মতামত দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা যায়।
সভায় বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও প্রয়োজনীয় আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অভাবে স্বর্ণ খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। সরকার এখন এই খাতকে একটি সুসংগঠিত ও স্বীকৃত শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।
প্রস্তাবিত নীতিমালায় বৈধভাবে আমদানি করা স্বর্ণের আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণ—প্রতিটি ধাপকে একটি সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। এতে স্বর্ণের উৎস, মজুত ও লেনদেনের তথ্য সহজে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার। সংশ্লিষ্টদের আশা, এর ফলে বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অবৈধ বাণিজ্য ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি আসবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, স্বর্ণ খাতকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আনতে পারলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বৈধ আমদানি সম্প্রসারণ এবং সরকারের রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীরা একটি সুস্পষ্ট নীতিগত কাঠামোর মধ্যে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পাবেন।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বজুড়ে স্বর্ণকে মূল্য সংরক্ষণের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি স্বর্ণও রিজার্ভ হিসেবে সংরক্ষণ করে। বাংলাদেশেও বৈধভাবে আমদানি করা স্বর্ণ দেশের ভেতরে থাকলে তা জাতীয় সম্পদ সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বাজারে চোরাচালান নিরুৎসাহিত করতে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের স্বর্ণমূল্যের সামঞ্জস্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তার মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দামের বড় ব্যবধান তৈরি হলে অবৈধ আমদানি ও পাচারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই শুল্ক ও কর কাঠামো নির্ধারণে আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারের প্রবণতাও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
শুধু আমদানিই নয়, স্থানীয়ভাবে মূল্য সংযোজন করে স্বর্ণালংকার উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধির বিষয়টিও নতুন নীতিমালায় গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকার মনে করছে, যৌক্তিক শুল্কে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বাড়ানো গেলে দেশীয় উদ্যোক্তা ও কারিগররা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পণ্য উৎপাদনে সক্ষম হবেন।
নীতিমালা চূড়ান্ত করার আগে ভারতসহ বিশ্বের কয়েকটি প্রধান স্বর্ণালংকার রপ্তানিকারক দেশের নীতি, শুল্কব্যবস্থা, সংরক্ষণ কাঠামো এবং রপ্তানি সুবিধা পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বাস্তবায়নের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও করণীয় বিষয়ে লিখিত সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন নীতিমালার উদ্দেশ্য ব্যবসায়ীদের জন্য অতিরিক্ত জটিলতা সৃষ্টি করা নয়; বরং একটি স্বচ্ছ, টেকসই ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। অংশীজনদের মতামত পর্যালোচনার পর প্রয়োজনে আরও আলোচনা করে নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে নতুন নীতিমালা দেশের স্বর্ণ খাতকে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি থেকে বের করে একটি আধুনিক, নিয়ন্ত্রিত ও রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপান্তরের পথ তৈরি করতে পারে।