- ০৩ আগস্ট, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
যুক্তরাষ্ট্রের আইডাহো অঙ্গরাজ্যের ছোট্ট বিশ্ববিদ্যালয় শহর মস্কো। ২০২২ সালের নভেম্বরের এক শীতল রাতে অন্য দিনের মতোই শহরটি ছিল শান্ত। সপ্তাহান্তের ব্যস্ততা শেষে কেউ ফিরেছিলেন পার্টি থেকে, কেউ পরদিনের ক্লাসের প্রস্তুতি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু রাত পেরিয়ে ভোর হওয়ার আগেই একটি বাড়িতে ঘটে যায় ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড। মুহূর্তেই চারটি পরিবারের জীবন বদলে যায় চিরতরে।
২০২২ সালের ১৩ নভেম্বর ভোররাতে ইউনিভার্সিটি অব আইডাহোর কাছের একটি ভাড়াবাড়িতে ধারালো অস্ত্রের হামলায় নিহত হন চার শিক্ষার্থী ইথান চ্যাপিন, কেলি গনকালভেস, জ্যানা কার্নোডল ও ম্যাডিসন মোগেন। তারুণ্যের শুরুতেই থেমে যায় চারটি জীবনের পথচলা। এ হত্যাকাণ্ড শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বজুড়েই ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
ঘটনার পর তদন্তকারীদের সামনে ছিল অসংখ্য প্রশ্ন। কে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন? কেন একই বাড়িতে থাকা চার শিক্ষার্থীকে লক্ষ্য করা হলো? হত্যার পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল? দীর্ঘ তদন্তের পর অভিযুক্ত শনাক্ত হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর আজও মেলেনি কেন?
এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত, বিচার এবং অমীমাংসিত রহস্য নিয়ে নেটফ্লিক্স নির্মাণ করেছে তিন পর্বের তথ্যচিত্র ‘দ্য আইডাহো মার্ডারস: কলেজ নাইটমেয়ার’। গত ২৯ জুলাই মুক্তি পাওয়া তথ্যচিত্রটিতে নতুন করে উঠে এসেছে হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা, তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, অভিযুক্তের অতীত এবং নিহতদের স্বজনদের দীর্ঘ শোকের গল্প।
হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তের শুরুতে পুলিশ কার্যত অন্ধকারে ছিল। কোনো প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায়নি। হামলাকারীর পরিচয় কিংবা হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কেও স্পষ্ট কোনো তথ্য ছিল না।
তদন্তের মোড় ঘুরে যায় ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা একটি ছুরির খাপ থেকে। ওই খাপে পাওয়া একটি ক্ষুদ্র ডিএনএ নমুনা বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা ব্রায়ান কোহবার্গারের দিকে অগ্রসর হন।
পরে ঘটনাস্থলের আশপাশের নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে একটি সাদা গাড়ির চলাচলের তথ্য পাওয়া যায়। মুঠোফোনের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেও কোহবার্গারের গতিবিধি নিয়ে সন্দেহ জোরালো হয়। তদন্তকারীদের তথ্যমতে, হত্যাকাণ্ডের সময় তার মুঠোফোন কিছু সময় নেটওয়ার্কের বাইরে ছিল।
ডিএনএ নমুনা, গাড়ির গতিবিধি এবং প্রযুক্তিগত তথ্যসহ বিভিন্ন সূত্র একত্র করে তদন্তকারীরা কোহবার্গারকে গ্রেপ্তার করেন।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে চার শিক্ষার্থী হত্যার দায় স্বীকার করেন তিনি। পরে চারটি হত্যাকাণ্ডের দায়ে তাকে প্যারোলের সুযোগ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মামলার বিচারিক নিষ্পত্তি হলেও হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য নিয়ে রহস্য কাটেনি। কেন ওই চার শিক্ষার্থীকে বেছে নেওয়া হয়েছিল, কেন ওই বাড়িতেই হামলা চালানো হয়েছিল কিংবা কী কারণে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয় এসব প্রশ্নের কোনো নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যায়নি।
বিচার শুরুর আগেই কোহবার্গার দোষ স্বীকার করায় দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় তার উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা বা মানসিক অবস্থার বিস্তারিত বিশ্লেষণের সুযোগ হয়নি।
তথ্যচিত্রে মস্কো পুলিশের প্রধান অ্যান্থনি ডালিঙ্গার বলেন, তদন্তে বহু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলেও হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি। তার ধারণা, এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো আর কোনো দিন জানা যাবে না।
কোহবার্গারের শিক্ষাজীবনের তথ্য প্রকাশের পর আরও বিস্মিত হয় মানুষ। তিনি ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ক্রিমিনোলজি বা অপরাধবিদ্যা বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। এর আগে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও অর্জন করেছিলেন।
তথ্যচিত্রে তার সাবেক সহপাঠী লিলি কারাবান বলেন, সিরিয়াল কিলার নিয়ে ক্লাসের আলোচনায় কোহবার্গার প্রায়ই নিজেকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চাইতেন। দলীয় আলোচনায় অন্যদের মতামতের প্রতি তার আগ্রহ কম ছিল বলেও দাবি করেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন অনেকটা একাকী।
তদন্তে আরও জানা যায়, গবেষণার অংশ হিসেবে দাবি করে কোহবার্গার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডিটে একটি প্রশ্নাবলি প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে কারাবন্দীদের কাছে অপরাধ সংঘটনের সময় তাদের চিন্তা, ভুক্তভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল।
তথ্যচিত্রে অংশ নেওয়া কয়েকজনের ধারণা, অপরাধবিদ্যার প্রতি তার আগ্রহ হয়তো শুধু শিক্ষাগত গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের মতে, ‘নিখুঁত অপরাধ’ সম্পর্কে তার একধরনের বিকৃত কৌতূহল থাকতে পারে। তবে এ ধারণার পক্ষে আদালতে কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি।
তথ্যচিত্রে কোহবার্গারের আচরণ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীর অভিযোগও উঠে এসেছে। তাদের কেউ কেউ তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, তার আচরণে তারা অস্বস্তি বোধ করতেন।
এক নারী শিক্ষার্থীর অভিযোগ, একবার কোহবার্গার তাকে গাড়ি পর্যন্ত অনুসরণ করেছিলেন এবং আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে কথা বলেছিলেন।
তার সাবেক সহপাঠী লিলি কারাবানের ধারণা, নারীদের প্রতি কোহবার্গারের গভীর ক্ষোভ ছিল। তিন নারী ভুক্তভোগীর ওপর চালানো নির্মমতার সঙ্গে সেই মানসিকতার যোগ থাকতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
তবে এসব বক্তব্য তথ্যচিত্রে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের নিজস্ব মূল্যায়ন। হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য বা নারীবিদ্বেষের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে আদালত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।
মামলার রায় হলেও নিহতদের পরিবারের শোক ও প্রশ্নের অবসান হয়নি। অনেক স্বজন চেয়েছিলেন, মামলাটি পূর্ণাঙ্গ বিচারের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাক। তাদের আশা ছিল, আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় অন্তত হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু জানা যাবে।
নিহত কেলি গনকালভেসের বাবা স্টিভ গনকালভেস মনে করেন, মৃত্যুদণ্ড না হওয়ায় কোহবার্গার অনেকটাই রেহাই পেয়েছেন। কেলির বোন আলিভিয়াও একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এমন নৃশংস অপরাধের জন্য কোনো ধরনের আইনি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
অন্যদিকে নিহত জ্যানা কার্নোডলের বোন জ্যাজমিন বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখেন। তার মতে, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া পরিবারের সদস্যদের বারবার সেই ভয়াবহ ঘটনার মুখোমুখি করত এবং মানসিক যন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে দিত। সমঝোতার মাধ্যমে মামলার নিষ্পত্তি হওয়ায় পরিবারগুলো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ পেয়েছে।
মামলার রায়ের এক বছর পর আবারও আলোচনায় আসেন কোহবার্গার। ২০২৬ সালে কারাগার থেকে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, তিনি নির্দোষ।
তার ভাষ্য, দোষ স্বীকারের প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ভুল হয়েছে এবং বিষয়টি নতুন করে আদালতের বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তিনি নিজের দণ্ডের বিরুদ্ধে আবেদনও করেছেন।
তবে আদালতের দেওয়া রায় এখনো বহাল রয়েছে। কোহবার্গার বর্তমানে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থার কারাগারে যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন।
সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত অনেক অপরাধভিত্তিক তথ্যচিত্রে অপরাধী শনাক্ত বা বিচারিক রায়ের মধ্য দিয়ে গল্পের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু ‘দ্য আইডাহো মার্ডারস: কলেজ নাইটমেয়ার’ দর্শকদের সামনে ভিন্ন এক বাস্তবতা তুলে ধরে।
এখানে হত্যাকারীর পরিচয় জানা গেছে। জানা গেছে, কীভাবে ডিএনএ নমুনা, নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ ও প্রযুক্তিগত তথ্যের সূত্র ধরে তাকে শনাক্ত করা হয়েছিল। আদালতের রায়ও হয়েছে। তবু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উত্তরহীন কেন?
এই ‘কেন’-এর জবাব না মেলার কারণেই তথ্যচিত্রটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের পুনর্নির্মাণ নয়। এটি মানুষের মনস্তত্ত্ব, বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, স্বজন হারানোর দীর্ঘ বেদনা এবং অসময়ে থেমে যাওয়া চার তরুণ জীবনের এক অসমাপ্ত গল্প।