- ৩০ জুলাই, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
তাঁর সিনেমায় সময় কখনো সামনে এগোয়, কখনো ফিরে যায় অতীতে। কখনো একই ঘটনার ভেতর খুলে যায় একাধিক সময়ের দরজা। জটিল গল্পের কাঠামো, বাস্তব দৃশ্য নির্মাণ এবং প্রযুক্তির অভিনব ব্যবহার সব মিলিয়ে ক্রিস্টোফার নোলান আজ বিশ্ব সিনেমার অন্যতম প্রভাবশালী নাম।
‘মেমেন্টো’, ‘দ্য ডার্ক নাইট’, ‘ইনসেপশন’, ‘ইন্টারস্টেলার’, ‘ডানকার্ক’, ‘টেনেট’ ও ‘ওপেনহেইমার’ প্রতিটি সিনেমায় তিনি দর্শককে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছেন। তাঁর নতুন ছবি মুক্তির ঘোষণা এলেই বিশ্বজুড়ে শুরু হয় আলোচনা। সর্বশেষ ‘দ্য অডিসি’ নিয়েও দর্শকদের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে।
বুধবার (৩০ জুলাই) অস্কারজয়ী এই ব্রিটিশ নির্মাতার ৫৬তম জন্মদিন। বিশেষ দিনটিতে ফিরে দেখা যেতে পারে তাঁর সিনেমার প্রতি ভালোবাসা, সংগ্রামের পথ এবং বিশ্বজয়ের গল্প।
১৯৭০ সালের ৩০ জুলাই যুক্তরাজ্যের লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারে জন্ম নোলানের। তাঁর বাবা একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করতেন এবং মা ছিলেন শিক্ষক ও বিমানবালা। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।
মাত্র সাত বছর বয়সে বাবার সুপার-৮ ক্যামেরা হাতে পান নোলান। এরপর খেলনা ও ছোট ছোট সেট ব্যবহার করে নিজেই চলচ্চিত্র বানাতে শুরু করেন। ‘স্টার ওয়ার্স’ সিরিজের সিনেমা তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
ছোট বয়সেই তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন, সিনেমা কেবল গল্প বলার মাধ্যম নয়; এটি দর্শককে অন্য এক জগতে নিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা।
পরে লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন নোলান। চলচ্চিত্র বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র সমিতিতে কাজ করতে গিয়ে হাতে-কলমে নির্মাণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
একসময় ফিল্ম স্কুলে ভর্তির জন্য আবেদন করেছিলেন তিনি। তবে সেই আবেদন গ্রহণ করা হয়নি। প্রত্যাখ্যানের পরও থেমে না গিয়ে বন্ধুদের নিয়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ছোট চলচ্চিত্র নির্মাণ চালিয়ে যান।
নোলানের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ফলোয়িং’ নির্মিত হয়েছিল সীমিত অর্থ ও স্বল্পসংখ্যক কর্মী নিয়ে। সপ্তাহান্তে বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমাটির শুটিং করতেন তিনি। অনেক অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলী পারিশ্রমিক ছাড়াই কাজ করেছিলেন।
সিনেমাটি সমালোচকদের নজর কাড়লেও নোলানের ক্যারিয়ারে বড় মোড় আসে ‘মেমেন্টো’র মাধ্যমে। স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত এক ব্যক্তির গল্পকে উল্টো সময়রেখায় উপস্থাপন করে তিনি বিশ্ব সিনেমায় নতুন আলোচনার জন্ম দেন।
শুরুতে ছবিটির সমাপ্তি ও গল্প বলার ধরন নিয়ে কিছু পরিবেশক দ্বিধায় ছিলেন। পরে সিনেমাটি ব্যাপক প্রশংসা পায় এবং অস্কারের মনোনয়ন অর্জন করে।
এরপর ‘ব্যাটম্যান বিগিনস’ দিয়ে সুপারহিরো সিনেমাকে বাস্তবধর্মী ও মনস্তাত্ত্বিক নতুন মাত্রা দেন নোলান। ‘দ্য ডার্ক নাইট’ পরবর্তীতে শুধু জনপ্রিয় সুপারহিরো সিনেমা নয়, আধুনিক চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
নোলানের সিনেমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য সময়ের ভিন্ন ব্যবহার। তাঁর গল্পে সময় কেবল ঘটনার পটভূমি নয়, অনেক ক্ষেত্রেই গল্পের চালিকাশক্তি।
‘মেমেন্টো’তে সময়ের গতিপথ উল্টো দিকে এগিয়েছে। ‘ইনসেপশন’-এ স্বপ্নের ভেতর তৈরি হয়েছে একাধিক স্তর। ‘ইন্টারস্টেলার’-এ আপেক্ষিকতার প্রভাবে সময়ের ভিন্ন গতি তুলে ধরা হয়েছে। ‘টেনেট’-এ দেখা গেছে সময়ের বিপরীত প্রবাহ। আর ‘ওপেনহেইমার’-এ একাধিক সময়রেখার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে জটিল বর্ণনা।
তবে জটিলতা সৃষ্টি করাই নোলানের উদ্দেশ্য নয়। তাঁর সিনেমা দর্শককে গল্পের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে বাধ্য করে। দর্শককে ভাবতে হয়, ঘটনার সূত্র খুঁজতে হয় এবং চরিত্রের সিদ্ধান্তের ভেতরে প্রবেশ করতে হয়।
ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগেও সেলুলয়েড ফিল্মের প্রতি নোলানের আগ্রহ অটুট। তিনি বড় পরিসরে ৭০ মিলিমিটার ফিল্ম ও আইম্যাক্স ক্যামেরা ব্যবহার করতে পছন্দ করেন।
কম্পিউটারনির্ভর দৃশ্যের পরিবর্তে বাস্তব লোকেশন, ব্যবহারিক কৌশল এবং ক্যামেরার সামনে প্রকৃত দৃশ্য নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দেন তিনি।
‘ইনসেপশন’-এর ঘূর্ণমান করিডর, ‘দ্য ডার্ক নাইট’-এ বাস্তব ট্রাক উল্টে দেওয়ার দৃশ্য এবং ‘ওপেনহেইমার’-এ ব্যবহারিক বিস্ফোরণ এসব তাঁর নির্মাণদর্শনের পরিচয় বহন করে।
প্রযুক্তির বিরোধিতা নয়, বরং গল্পের প্রয়োজনে প্রযুক্তির ব্যবহারেই বিশ্বাসী নোলান। তাঁর মতে, প্রযুক্তি গল্প বলার একটি মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু কখনো গল্পের বিকল্প হওয়া উচিত নয়।
নোলানের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গীদের একজন তাঁর স্ত্রী এমা টমাস। বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকেই তাদের পরিচয়।
এমা শুধু তাঁর জীবনসঙ্গী নন, নোলানের অধিকাংশ সিনেমার প্রযোজকও। দুজন মিলে প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘সিনকোপ’। হলিউডে দীর্ঘদিন ধরে সফল পরিচালক-প্রযোজক অংশীদারত্বের অন্যতম উদাহরণ তাদের এই পথচলা।
কাজের ধরনেও অন্য অনেক নির্মাতার চেয়ে আলাদা নোলান। তিনি স্মার্টফোন খুব কম ব্যবহার করেন এবং ই-মেইলের ওপর নির্ভরশীল নন।
সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, সব সময় ইন্টারনেটে যুক্ত থাকা এবং নোটিফিকেশনের চাপ সৃজনশীল মনোযোগে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই দীর্ঘ সময় ধরে একটি ধারণা নিয়ে ভাবার জন্য তিনি নিজেকে ডিজিটাল বিভ্রান্তি থেকে দূরে রাখেন।
সাধারণত প্রযোজক, এজেন্ট কিংবা সহকারীদের মাধ্যমে তাঁর পেশাগত যোগাযোগ পরিচালিত হয়। মুখোমুখি আলোচনা ও টেলিফোনে কথা বলাকে তিনি বেশি কার্যকর মনে করেন।
শুটিং সেটেও অপ্রয়োজনীয় মানুষের উপস্থিতি পছন্দ করেন না নোলান। চিত্রনাট্য পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত নতুন প্রকল্প নিয়ে খুব বেশি আলোচনা করেন না। অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীদের কাছ থেকেও গোপনীয়তা বজায় রাখার প্রত্যাশা করেন।
২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ওপেনহেইমার’ নোলানের ক্যারিয়ারে নতুন ইতিহাস তৈরি করে। সিনেমাটি বক্স অফিসে ব্যাপক সাফল্যের পাশাপাশি অস্কারেও বড় অর্জন করে।
ছবিটি সাতটি অস্কার জেতে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো সেরা পরিচালকের অস্কার অর্জন করেন নোলান। একই সঙ্গে ‘ওপেনহেইমার’ জেতে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার।
অনেক চলচ্চিত্র সমালোচকের মতে, এই সাফল্য নোলানকে সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে।
ক্রিস্টোফার নোলান বহুবার ভারতীয় উপমহাদেশের কিংবদন্তি নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের কাজের প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে মানবিক গল্প বলা, চরিত্র নির্মাণ এবং সিনেমার স্বাভাবিক ছন্দ তাঁকে প্রভাবিত করেছে।
সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর ট্রিলজি’ ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’ ও ‘অপুর সংসার’ বিশ্ব সিনেমার অনন্য সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত। নোলানের মতে, এসব সিনেমা সময় ও সংস্কৃতির সীমা পেরিয়ে মানুষের সার্বজনীন অনুভূতির কথা বলে।
নোলানের নির্মাণশৈলী সত্যজিৎ রায়ের চেয়ে আলাদা হলেও চরিত্রের গভীরতা ও মানবিক আবেগকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে দুই নির্মাতার কাজের মধ্যে মিল খুঁজে পান অনেক সমালোচক।
‘ওপেনহেইমার’-এর সাফল্যের পর নোলানের পরবর্তী কাজ নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ ছিল ব্যাপক। তিনি বেছে নেন প্রায় ২ হাজার ৭০০ বছর পুরোনো গ্রিক মহাকাব্য ‘দ্য অডিসি’কে।
বিশাল বাজেটের এই চলচ্চিত্রে আধুনিক আইম্যাক্স প্রযুক্তির সঙ্গে প্রাচীন মহাকাব্যের গল্পকে নতুনভাবে পর্দায় তুলে ধরেছেন তিনি।
সিনেমাটির শুটিং হয়েছে মরুভূমি, পাহাড়, সমুদ্র ও দুর্গম শীতল অঞ্চলে। অনেক স্থানে পুরো ইউনিটকে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে সরঞ্জাম নিয়ে পৌঁছাতে হয়েছে। বিশাল আইম্যাক্স ক্যামেরা বহন করাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
নোলানের বিশ্বাস, স্টুডিওতে সব সময় প্রকৃতির মতো বাস্তব পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব নয়। প্রকৃতির মধ্যে এমন কিছু মুহূর্ত তৈরি হয়, যা পরিকল্পনা করে নির্মাণ করা যায় না।
তবে এত বড় প্রকল্প পরিচালনার চাপও অনুভব করেছেন তিনি। বিভিন্ন সময় তিনি স্বীকার করেছেন, নতুন সিনেমা মুক্তির আগে এখনো ভয় ও অনিশ্চয়তা কাজ করে।
তার মতে, একটি চলচ্চিত্র নির্মাতার হাতে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত দর্শকই সেটিকে পূর্ণতা দেন।
বিশ্বজুড়ে খ্যাতি, বক্স অফিসে বিপুল সাফল্য এবং একের পর এক পুরস্কার সবকিছুর পরও কাজের প্রতি নোলানের আগ্রহ কমেনি।
তাঁর দীর্ঘদিনের সহযাত্রী এমা টমাসের ভাষ্য, কোনো প্রকল্প শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন কাজের চিন্তায় অস্থির হয়ে ওঠেন নোলান। দীর্ঘ সময় সিনেমা থেকে দূরে থাকা তাঁর পক্ষে কঠিন।
‘দ্য অডিসি’র মতো বড় প্রকল্প শেষ করে বিশ্রামের প্রয়োজনের কথা বললেও নতুন গল্পের টান তাঁকে কত দিন দূরে রাখতে পারবে, সেটিই এখন প্রশ্ন।
সময়, স্মৃতি, পরিচয়, অপরাধবোধ এবং মানুষের সিদ্ধান্ত এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে নোলান যে নিজস্ব চলচ্চিত্রভাষা গড়ে তুলেছেন, তা ইতোমধ্যে বিশ্ব সিনেমায় আলাদা এক অধ্যায় হয়ে উঠেছে।
৫৬ বছরে পা রেখেও তাই তাঁর যাত্রা থেমে নেই। দর্শকদের অপেক্ষা এখন সময় নিয়ে খেলতে ভালোবাসা এই নির্মাতা পর্দায় পরের বিস্ময়টি কী নিয়ে আসেন।