- ০১ আগস্ট, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলেও সেই সম্ভাবনাকে এখনো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না রাষ্ট্রায়ত্ত জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ৩৬টি দেশে বিস্তৃত হলেও বাস্তবে অধিকাংশ কর্মী গেছেন মাত্র তিনটি দেশে—জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ব্রুনেই।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি, ভাষাগত দুর্বলতা, বিদেশি নিয়োগকারীদের চাহিদার সঙ্গে কর্মীদের দক্ষতার অমিল এবং নতুন শ্রমবাজারে নিয়মিত কর্মী সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে সম্ভাবনাময় অনেক বাজারে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হচ্ছে না।
বোয়েসেলের দেশভিত্তিক কর্মী পাঠানোর পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির শুরু থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি কর্মী গেছেন জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ব্রুনেইয়ে। অন্যদিকে তালিকাভুক্ত অনেক দেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা খুবই কম। কোনো কোনো বাজারে নির্দিষ্ট কয়েক বছরে একজন কর্মীও পাঠানো সম্ভব হয়নি।
অভিবাসন খাতের বিশ্লেষকদের মতে, শুধু নতুন দেশের তালিকা বাড়ালেই শ্রমবাজার সম্প্রসারণ হয় না। প্রতিটি দেশের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষিত, দক্ষ ও ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন কর্মী তৈরি করতে না পারলে নতুন বাজারে টেকসই অবস্থান গড়ে তোলা কঠিন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বোয়েসেল রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বুলগেরিয়া, মালদ্বীপ, ফিজি ও রাশিয়াসহ কয়েকটি নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছে। তবে এসব দেশে এখনো কর্মী পাঠানোর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। বিপরীতে জর্ডান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত নিয়োগব্যবস্থা এবং নির্দিষ্ট কর্মী নেওয়ার কাঠামো থাকায় সেখানে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর হার বেশি।
বিশ্ব শ্রমবাজারে এখন সাধারণ নির্মাণশ্রমিকের পাশাপাশি বিভিন্ন কারিগরি ও পেশাগত দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। ওয়েল্ডার, ইলেকট্রিশিয়ান, মেশিন অপারেটর, কেয়ারগিভার, নার্স, হসপিটালিটি খাতের কর্মী এবং তথ্যপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট দক্ষ জনবলের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে ইউরোপের অনেক দেশে জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং শ্রমিকসংকটের কারণে বিদেশি কর্মী নিয়োগের সম্ভাবনা বাড়ছে। তবে এসব বাজারে কাজের সুযোগ কাজে লাগাতে নির্দিষ্ট দক্ষতা, কার্যকর ভাষাজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দক্ষ কর্মীর পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা। অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান অভিজ্ঞ ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী চাইলেও দেশে সেই মানের জনবল প্রয়োজনীয় সংখ্যায় তৈরি হচ্ছে না। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অনেক দেশে নিয়মিত কর্মী পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
বোয়েসেলের ২০২৩–২৪ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময়ে মালয়েশিয়া, রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বুলগেরিয়া, ফিজি, রাশিয়া, মালদ্বীপ, ব্রুনেই ও লেবাননসহ কয়েকটি নতুন শ্রমবাজারে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপদ, নৈতিক এবং তুলনামূলক কম খরচে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে অভিবাসন খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাজার অনুসন্ধানের পাশাপাশি কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। কারিগরি প্রশিক্ষণের মান বাড়ানো, বিদেশি ভাষা শিক্ষা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সনদ প্রদান এবং নিয়োগকারী দেশের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা না গেলে নতুন বাজারের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে না।
বোয়েসেলের নির্বাহী পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. শওকত আলী বলেন, দেশে জনশক্তির কোনো অভাব নেই। তবে দক্ষতা ও বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এই জনশক্তিকে প্রত্যাশিত মাত্রায় কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, দক্ষ কর্মী তৈরির পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারও এ বিষয়ে আন্তরিক। বোয়েসেল শুধু মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না; ইউরোপের পাশাপাশি উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশেও বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে কাজ করছে।
বোয়েসেল রাষ্ট্রায়ত্ত জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হলেও দেশের মোট বৈদেশিক কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যান সংরক্ষণ ও প্রকাশ করে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ থেকে বছরে ১০ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে গেলেও তাদের বড় অংশই বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মসংস্থান পেয়েছেন।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিদেশে কাজের জন্য ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান এক্সচেঞ্জ চালু, দক্ষতা উন্নয়নকেন্দ্র সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জনশক্তি গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিবাসন খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করার চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন সেই বাজারের উপযোগী কর্মী তৈরি করা। ভাষাজ্ঞান, আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষতার সনদায়ন এবং চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে বোয়েসেলের মাধ্যমে আরও বেশি দেশে নিয়মিত কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এর ফলে বিদেশে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে দেশের রেমিট্যান্স আয়ও আরও স্থিতিশীল ও টেকসই ভিত্তি পাবে।